সময় যেন নীরব এক যাত্রী-চলে যায়, অথচ রেখে যায় পদচিহ্ন। ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে ১৯৫৭ সালটি যেন এক আলোকবর্তিকা। সে বছরই শুরু হয় এক জ্ঞানের অভিযাত্রা, আত্মপ্রকাশ ঘটে সাপ্তাহিক আরাফাত-এর। আজ সেই পথচলা ছুঁয়ে ফেলেছে ৬৭তম সিঁড়ি। আমাদের এই দীপ্ত অভিযাত্রার পেছনে যেমন আছে কষ্টের কাহিনী, তেমনি আছে গৌরবের ইতিহাস, আত্মত্যাগের প্রতিচ্ছবি এবং এক মহৎ লক্ষ্যকে ধারণ করার দৃঢ়তা।
আরাফাত- শুধু একটি পত্রিকার নাম নয়, এটি একটি চিন্তা, একটি দৃষ্টিভঙ্গি, একটি আদর্শের বাণীবাহক। যার হৃদয়জুড়ে কুরআন-সুন্নাহর সুশীতল ছায়া, যার প্রতিটি পৃষ্ঠায় মেলে ধরা হয় ইসলামী ভাবনার সত্য, সৌন্দর্য ও সরলতা। সে ভাবনা যে আকিদায় রচিত, তা হলো সালাফে সালিহীনের উজ্জ্বল মানহাজ -যার ওপর দাঁড়িয়ে আমরা সত্য ও প্রজ্ঞার দীপ্ত আলো ছড়াতে চেয়েছি নিরন্তর।
স্মরণ করি সেই মহান ব্যক্তিত্বকে- আল্লামা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহিল কাফী আল কোরাইশী (রহিমাহুল্লাহ ) -যিনি একদা ভাষার আলোয়, মননের দীপ্তিতে এবং সাহসী কলমের ছোঁয়ায় এই পত্রিকাটিকে প্রাণ দিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিভা শুধু লেখনিতে নয়, ছিল নেতৃত্বেও, ছিল ঐক্যের আহ্বানে। তিনি প্রকাশ করেছিলেন মাসিক তর্জুমানুল হাদীস, আর তারপর হাতে তুলে নেন সাপ্তাহিক আরাফাত-এর শপথ।
সেই দীপ্ত শপথ আজ ৬৭ বছর পরেও আমাদের হৃদয়ে গাঁথা। কালের পরিক্রমায় সমাজে প্রযুক্তির আধিপত্য এসেছে, পাঠকের রুচিতে এসেছে পরিবর্তন, কিন্তু আরাফাত তার মূল আত্মা হারায়নি। হারায়নি নিরপেক্ষতা, যুক্তির ভারসাম্য এবং আদর্শের সরলতা।
আমরা গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি আরেক নক্ষত্রের নাম -প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আব্দুল বারী (রহিমাহুল্লাহ)। একাধারে শিক্ষক, চিন্তাবিদ ও সংগঠক এই মহান মানুষটি টানা ৪৩ বছর ধরে আরাফাত-এর জন্য নিজেকে নিবেদন করেছিলেন। তাঁর দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞার পরশে এ পত্রিকাটি পেয়েছে এক স্থায়িত্ব, এক প্রজ্ঞাময় পরিচয়। তার হাত ধরেই আরাফাত ছুঁয়েছে পাঠকের হৃদয়, সমাজের বিবেক, আর ভবিষ্যতের দিগন্ত।
এটি সত্য যে, কালের স্রোতে অনেক কিছুই বিস্মৃত হয়। কিন্তু আরাফাত থেকে যায়- তার নিজস্ব ভাষায়, নিজস্ব অভিব্যক্তিতে। কাগজের পাতায় নয় শুধু, পাঠকের চেতনায়। কারণ, এখানে লেখা হয় আলোকিত সমাজ গঠনের গাথা, তাওহীদের আহ্বান, সুন্নাহর সৌন্দর্য, আর সালাফি চিন্তার দীপ্তি।
এই বর্ষপূর্তিতে আমরা শুধু অতীত স্মরণে আবদ্ধ হতে চাই না; আমরা চাই নতুন দিনের শপথ নিতে -সত্য ও হক্বের পথে আরও দৃঢ় পদক্ষেপে অগ্রসর হতে। আমরা চাই, আমাদের নতুন প্রজন্ম কেবল পাঠক না হয়ে হয়ে উঠুক লেখক, চিন্তাবিদ, সত্যসন্ধানী। আরাফাত যেন তাদের জন্য হয় একটি জানালা -যেখান থেকে দেখা যায় কুরআন-সুন্নাহর নির্মল আকাশ।
আল্লাহ তা‘আলার অশেষ শোকরিয়া, যিনি আমাদের এই দীর্ঘ পথচলার তাওফীক্ব দিয়েছেন। সেই সঙ্গে সকল পাঠক, লেখক, শুভাকাঙ্ক্ষী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতিও আমাদের কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা -আপনারাই আমাদের প্রেরণা।
৬৭ বছরে পা রাখা আরাফাত আজ নতুন করে প্রতিজ্ঞা করছে-
“আমরা লিখে যাবো হক্বের কথা, ছড়িয়ে দেবো সত্যের আলো, যতদিন কলমে থাকবে কালি, হৃদয়ে থাকবে ঈমান।”

আপনার মন্তব্য1