সাময়িক প্রসঙ্গ
আলেমদের জীবিকার্জন : একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা
আবু সা‘দ ড. মো. ওসমান গনী

মানবজাতিকে ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির পথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহ তা‘আলা যুগে যুগে পাঠিয়েছেন অসংখ্য নবী ও রাসূল। এই ধারাবাহিকতার শেষ হয়েছে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে। তিনিই সর্বশেষ নবী ও রাসূল, তারপর আর কোনো নবী আসবেন না। কুরআনুল কারীমে উল্লেখ আছে-

﴿مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍمِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُوْلَ اللهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّيْنَ وَكَانَ اللهُبِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيْمًا﴾

“মুহাম্মদ (সা.) তোমাদের মধ্যকার কোনো পুরুষের পিতা নয়, কিন্তু সে আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞাত।”[১] কিন্তু যুগ পরম্পরায়, কালের পরিক্রমায় আলেমরা নবীদের উত্তরাধিকারীহিসেবে দ্বীন-ইসলামের দায়িত্ব পালন করবেন। সে হিসেবে সমাজের হক্কানি আলেমদের মর্যাদা অনেক বেশি। এরাই ‘ওয়ারেসাতুল আম্বিয়াহ্’। মুহাম্মদ (সা.)-এর বাচনিক উদ্ধৃতিতে পাওয়া যায়, আলেমের মর্যাদা আবেদেরও পরে ওইরূপ, পূর্ণিমার রাতে চাঁদের মর্যাদা অন্য তারকাগুলোর ওপর যেইরূপ।[২]

বর্ণিত হাদীসের ব্যাখ্যায় আল্লামা কাজী আয়াজ (রহ্.) বলেন, এই তুলনার কারণ হলো- নক্ষত্রের আলো দ্বারা সে কেবল নিজেই আলোকিত হয়। কিন্তু চাঁদের আলো নিজেকে ছাড়াও অন্যকে আলোকিত করে। অনুরূপভাবে আবেদ তার ‘ইবাদতের দ্বারা কেবল নিজের আত্মিক উন্নতি ঘটায়। কিন্তু একজন আলেম তার ‘ইল্ম দ্বারা নিজে যেমন উপকৃত হন তেমনি অন্যদের উপকার করে থাকেন।

সুপ্রিয় পাঠকমণ্ডলী! আলেমকারা? এ সম্পর্কে যৎকিঞ্চিৎ আলোচনার প্রয়োজন। আলেম শব্দটি ‘ইল্ম থেকে উৎসারিত। যারঅর্থ হলো জ্ঞানী, শিক্ষিত যিনি জানেন। ‘ইল্ম থেকে উৎসারিত আরো কতিপয় শব্দ যেমন- উলুম, মুআল্লিম, আল্লামা, তা’লিম ইত্যাদি শব্দ বাংলাভাষী মুসলমানদের কাছে কম-বেশি সুপরিচিত।

আরবরা যদিও ‘ইল্ম ও আলেম শব্দ দ্বারা যেকোনো সাধারণ বিষয়ের জ্ঞান এবং ওই বিষয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিকে বুঝিয়ে থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশে সে রকমটি বুঝানো হয় না। এখানে ‘ইল্ম বলতে দ্বীনি বা ধর্মীয়জ্ঞান এবং আলেম বলতে দ্বীনি বা ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিকেই বোঝানো হয়।

ওলামা বলতে এমন লোকদের বোঝানো হয়, যারা মহান আল্লাহর সত্তাও গুণাবলী সম্পর্কে সম্যকভাবে অবগত এবং বিশ্বের সৃষ্টিকূলে, তার আবর্তন-বিবর্তন ও পরিবর্তন সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করেন। সৃষ্টি বৈচিত্র্য সম্পর্কে, দিবা-রাতের হ্রাস-বৃদ্ধি নিয়ে চিন্তা করেন। কেবল নাহু-সরফ, ফিক্বাহ, অলংকারশাস্ত্র কিংবা বিশুদ্ধ আরবি ও ফার্সি জানা ব্যক্তিদেরকে ওলামা বলা হয় না। ইসলামী পরিভাষায় ‘ইল্ম বলতে বোঝানো হয়, হালাল-হারাম, ন্যায়-অন্যায় ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্য সম্পর্কিত জ্ঞান এবং আল্লাহ ও তার রাসূল (সা.)-এর নির্দেশিত পথে জীবনাচারের শিক্ষা। সাধারণভাবে বলা যায় যে, পবিত্র কুরআন ও হাদীস থেকে অর্জিত জ্ঞানই হলো ‘ইল্ম। আর যিনি কুরআন ও হাদীসের আলোকে পূর্ব বর্ণিত হালাল-হারাম এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য সম্পর্কিত জ্ঞানের অধিকারী হন তিনিই হলেন আলেম।

সুফ্ইয়ান সাওরী (রাযি.) হতে বর্ণিত যে, একদা ‘উমার (রাযি.) আকাবিরে তাবেয়ীনদের অন্যতম কাহে আহবার (রাযি.)-কে জিজ্ঞেস করলেন সাহেবে ‘ইল্ম বা প্রকৃত আলেম কারা? প্রত্যুত্তরে কা’ব (রাযি.) বললেন, সাহেবে ‘ইল্ম বা প্রকৃত আলেম তারা যারা স্বস্ব অর্জিত ‘ইল্ম অনুযায়ী ‘আমলও করেন। মিশকা-তুলমাসা-বীহ’র বর্ণনা সূত্রে জানা যায়, পুনরায় ‘উমার (রাযি.) জিজ্ঞেস করলেন, কোন বস্তু আলেমদের অন্তর হতে ‘ইল্ম বের করে দেয়? উত্তরে কা’ব (রাযি.) জানালেন, (পার্থিব) লোভ-লালসা (আলেমদের অন্তর হতে) ‘ইল্মকে বের করে দেয়।

ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, এ উম্মতের আলেমরা দু’শ্রেণিতে বিভক্ত। প্রথম শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন সে আলেম যাকে আল্লাহ তা‘আলা অনুগ্রহ করে ‘ইল্ম দান করেছেন, আর সে লোভ-লালসার বশীভূত হয়ে মানুষের নিকট থেকে কোনোরূপ বিনিময় গ্রহণ করেননি কিংবা তা বিক্রয়ও করেননি। সেই আলেমের জন্য জল ভাগের মৎস ও স্থল ভাগের প্রাণী এবং মহাশূন্যে উড়ন্ত পক্ষীকুল মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করে।

আর দ্বিতীয় শ্রেণীর আলেম হচ্ছে- যাকে আল্লাহ ‘ইল্ম দান করেছেন, কিন্তু সে আল্লাহর বান্দাদের সাথে (তার ‘ইল্ম বিতরণের ব্যাপারে) কৃপণতা করেছে। লোভ-লালসার বশবর্তী হয়ে (‘ইলম খরচ করে কিংবা ‘ইল্ম শিক্ষা দিয়ে) বিনিময় গ্রহণ করেছে এবং মূল্যের বিনিময়ে বিক্রয় করেছে। (তার শাস্তি হলো) কিয়ামত দিবসে তাকে আগুনের লাগাম দেয়া হবে এবং একজন আহ্বানকারী শব্দ করতে (বলতে) থাকবেন যে, “এই ব্যক্তি হচ্ছে ওই আলেম, যাকে আল্লাহ সদয় হয়ে ‘ইল্ম দান করেছিলেন, কিন্তু সে আল্লাহর বান্দাদের সাথে (‘ইল্মের ব্যাপারে) কৃপণতা করেছে, লোভের তাড়নায় বিনিময় গ্রহণ করেছে এবং মূল্যের বিনিময়ে ‘ইল্ম বিক্রয় করেছে।” আর এভাবে হাশ্র ময়দানের কাজ সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত শব্দ করতে থাকবে।

কীভয়ানক পরিণাম! তাহলে আলেমদের গ্রাসাচ্ছদনের ব্যবস্থা? সংসার কেমনে চলবে? চাল-ডাল,বাড়ি-ভাড়া ইত্যকার নানা খরচ কীভাবে যোগান দেবেন? এমনিতরো গুরুতর প্রশ্নে আমরা জড়সড় হয়ে পড়ি। নিরুত্তর মৌনতার সম্মতি। কিন্তু নাহ! আমাদের নবীদের দিকে তাকাতে হবে। তাকাতে হবে সাহাবী আজমাঈন, তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ীন ও সালফে সালেহীনদের দিকে। মাত্র ক’দশক আগেও চোখ ফিরালে আমরা জানতে পারবো আলেমরা কীভাবে তাদের নিত্য প্রয়োজন মেটাতেন। অন্যের গলগ্রহ না হয়ে মর্যাদার সাথে বসবাসের হাজারো অনুপম দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে বিরাজমান। অনন্তকালের সুখ লাভের প্রত্যাশায়, আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য ও রেজামন্দি লাভের আশায় বৈষয়িক প্রাপ্তিকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ জ্ঞান করেছেন। বৈষয়িক লেন-দেন ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যানও করেছেন।

নবী-রাসূল (সা.) সাহাবায়ে কেরাম ও আকাবিরদের প্রায় প্রত্যেকেই সংসাব পরিচালনা করার জন্য কোনো একটি পেশাকে বেছে নিয়েছিলেন। দাঊদ (রহ্.) রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি লৌহবর্ম তৈরি করতেন। সুলাইমান (রাযি.) ঝুড়ি বানাতেন। আমাদের প্রিয়নবী (সা.) ও সাহাবায়ে কিরামের অনেকেই নানা ধরনের ব্যবসা করেছেন। রাসূল (সা.) যৌবনে একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। জারেক নামক স্থানে তিনি কৃষি কাজও করেছেন। তাঁদের জীবনেতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁরা হালাল উপার্জনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তবে তা জ্ঞানচর্চায় কোনো ব্যাঘাত ঘটায়নি। তদীয় জীবিকা ও জ্ঞানচর্চার মধ্যে ভারসাম্য ছিল বিস্ময়কর; বরং পেশা বা আয়ের সুসংহত পৃথকখাত থাকায় তারা নিশ্চিন্তে জ্ঞানচর্চা করতে পারতেন। জীবন ধারনের জন্য জীবিকার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। ইসলাম কখনো এর গুরুত্ব অস্বীকার করেনি; বরং বিভিন্নভাবে জীবিকার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। কুরআনুল কারীমে দুনিয়ার সমুদয় কল্যাণ কামনা করে দু‘আও শিখানো হয়েছে। যেমন-

﴿رَبَّنَاآتِنَا فِيْ الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِيْ الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَالنَّارِ﴾

“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন। আর পরকালেও কল্যাণ দান করুন। আর আমাদেরকে (জাহান্নামের) আগুনের ‘আযাব থেকে রক্ষা করুন।”[৩]

আমাদের সালফে-সালেহীনদের মধ্য থেকে অনেকেই ‘ইল্মের সুখ্যাতির পাশাপাশি অন্যান্য পেশায় প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন। ইতিহাসে অনেক আলেমের নাম পাওয়া যায় যাদের নামের অংশ হিসেবে বিভিন্ন উপাধি জ্ঞাপক শব্দ যেমন- ‘কুদুরী’ (হাড়ি-পাতিল নির্মাতা), ‘বাযযায’ (বস্ত্র ব্যবসায়ী), ‘হাদ্দাদ’ (লৌহকার), ‘খাইয়াত’ (দর্জি), ওয়াররাক (বই বিক্রেতা) ইত্যাদি বিভিন্ন পেশা নির্ণায়ক শব্দযুক্ত করতে দেখা যায়। যার অর্থ তারা নিজেরা তাদের জীবিকা অর্জন এই পেশার মাধ্যমে করতেন। অনেকেই ‘ইল্মের পাশাপাশি তাদের সমাজের উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়ী ছিলেন। আবার এটাও ঠিক যে পার্থিব মুখ স্বাচ্ছন্দ্যকে কষাঘাত করে অনেকেই ‘ইল্মের বা দ্বীনের খিদমত করেছেন। ‘ইল্ম বা দ্বীনের খিদমতের স্বার্থে নিজের পেশা বা কারবার বর্জন করে শুধুমাত্র ‘ইল্মের সাথে দ্বীনের খিদমতের মাঝে নিজকে বিলীন করে অমর হয়ে রয়েছেন।

শাইখুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ্.) মাদ্রাসা শিক্ষার সাথে সাথে ছাত্রদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে তাগিদ দিয়েছেন। তিনি অভিমত দেন যে, মাধ্যমিক ও উচ্চতর শ্রেণীর ছাত্রদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে হাতের কাজ শেখাতে হবে। যেমন- চরকি চালানো, কাপড় বোনা, ঘড়ি মেরামত, বই-পুস্তক-খাতা বাঁধাই, চামড়া রং করা, বুট তৈরি, লোহার কাজ, স্বর্ণের কাজ, ইলেকট্রিক কাজ ইত্যাদি। উল্লিখিত কাজসমূহ নির্বাচনে ছাত্রদের স্বাধীনতা দেয়া হতো। অধূনা আলেমগণ তারা নিজের নামের শেষাংশে জন্মস্থানবাচক নাম জুড়ে দেন। পেশাভিত্তিক নাম দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। অর্থাৎ- অন্য কোনো পেশায় তাদের আগ্রহ নেই।

সুপ্রিয় পাঠকমণ্ডলী! আমরা জানি যে, ইসলামের প্রথম খলিফা আবূ বক্র (রাযি.) বস্ত্র ব্যবসায়ী ছিলেন। জীবিকার্জনের লক্ষ্যে তিনি দিনের কিছু সময় বাজারে অতিবাহিত করতেন। পরে রাষ্ট্রীয় কাজের চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় অনুরূদ্ধ হয়ে অতি সামান্য মাসোহারা গ্রহণ করতেন। দ্বিতীয় খলিফা ‘উমার (রাযি.)’র অনুরূপ ইতিহাস আমরা জানি। চতুর্থ খলিফা তো পরিষ্কার শ্রমজীবী ছিলেন। খিলাফত পরিচালনার পাশাপাশি গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য রীতিমত অন্যের গৃহে শ্রম দিয়েছেন।

এইতো কয়েক শ’ বছর আগেও পরাক্রমশালী মুঘল বাদশাহ আওরঙ্গজেব (রহ্.) নিজ হাতে কুরআনুল হাকীম লিপিবদ্ধ করতেন। তার তিনশ’ বছর আগে দিল্লীর সুলতান নাসিরুদ্দিনও কুরআন নকল করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কোনো বেতন-ভাতা নিতেন না। দারুল উলুম দেওবন্দের কুতুবখানায় বাদশাহ আওরঙ্গজেবের হস্তলিখিত কুরআনুল মাজীদের কপি হুবহু বিদ্যমান।

ইসলামে বিঘোষিত নীতিমালার একটি হলো জীবিকার জন্য স্বহস্ত উপার্জন। এটিই শ্রেষ্ঠ রিয্ক। দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার আগে শাইখুল ইসলাম মাওলানা কাসেম নানতুবি (রহ্.) মিরাটের একটি ছাপাখানায় প্রুফ দেখার কাজ করতেন। দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পর তা ছেড়ে দেয়ার তাগাদা দিয়ে চিঠি দেয়া হলে তিনি আরজ করলেন : সব ছেড়ে দিলে আমার পরিবার খরচ বহন করব কী করে? তাহলে কি তাঁর মাঝে কোনো তাক্বওয়া, পরহেজগারী ছিল না? অবশ্যই ছিল। অধিক তাক্বওয়ার ফলেই দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে তিনি কোনো দিনও বেতন গ্রহণ করেননি।

ইতিহাসের থেরোপাতায় চোখ বুলালে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। নিকট অতীতের ফকিহুল উম্মত রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী (রহ্.) বই বাঁধাইয়ের কাজ করে সংসারনির্বাহ করতেন। শাইখুল হিন্দ (রহ্.)’র আতর ব্যবসা ছিল। শাইখুল হাদীস ইয়াহিয়া কান্ধলভীর (রহ্.) ছাপাখানা ছিল। শাইখুল হাদীস জাকারিয়া (রহ্.) ও আশরাফ আলী থানভী (রহ্.) তাসনিফাতের কাজ করতেন। তাসনিফাত হলো বিষয়ভিত্তিক বই বা জ্ঞানের তালিকা তৈরি করা অথবা বিষয়বস্তুকে শ্রেণী অনুসারে সাজানো। আল্লামা মঞ্জুর নোমান (রহ্.) পত্রিকা সম্পাদনার কাজ করতেন। আলী মিয়া নদভী বই ব্যবসায় লিপ্ত ছিলেন।

প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ হাম্মাদ ইবনু যায়েদ ইবনু দিরহাম খ্যাতিমান মুহাদ্দিস ইমাম আইউব আস্ সাখাতিওয়ানির ছাত্র ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আইউব সাখাতিওয়ানির কাছে বাজারে যেতাম হাদীস পড়তে। তিনি বলতেন, তোমরা আমার সামনে বসে ক্রেতাদের পথ আটকে দিচ্ছ। আমার পেছনে বসো। তারপর যা জানতে চাও প্রশ্ন করো। পেশা বা আয়ের সুসংহত খাত থাকার ফলে তাদের ‘ইল্মচর্চার পথ মসৃণ হতো। ‘আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক তার ছাত্র হাসান ইবনু রবি কুফিকে প্রশ্ন করেছিলেন, তোমার পেশা কি? হাসান বললেন, ‘আমি চাটাই’র ব্যবসা করি। কয়েকজন কর্মচারি আছে। তারা চাটাই বানায় এবং বিক্রি করে।’ ‘আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক বলেন, ‘তোমার এই ব্যবসা না থাকলে আমার এখানে থাকা তোমার জন্য কঠিন হতো। আবূ ‘উমার মুহাম্মদ ইবনু খশনাম ইবনে আহমদ নিশাপুরী নিশাপুরের একজন প্রসিদ্ধ আলেম ছিলেন। তিনি কাগজের ব্যবসায় জড়িত ছিলেন।

আবুল ‘আব্বাস আহমদ ইবনু মুহাম্মদ ইবনে সা‘ঈদ ইবনুল ‘আব্দুর রহমান বসবাস করতেন কুফায়। পেশায় ছিলেন ওয়াররাক। খতীব বাগদাদী তার সুন্দর হস্তলিপির প্রশংসা করেছেন, আবূ মূসা সুলাইমান ইবনু মুহাম্মদ ইবনে আহমদ পরিচিত ছিলেন হামেদ বাগদাদী নামে। তিনি ছিলেন কুফার বিখ্যাত নাহুবিদ তিনিও পেশায় ওয়াররাকও ছিলেন। আবুল কাসেম সুলাইমান ইবনু ‘আব্দুল মালেকও ছিলেন পেশায় ওয়াররাক। মাহা নামক স্থানের আলেমগণ কুরআনের অনুলিপি প্রস্তুত করতেন। জগদ্বিখ্যাত পর্যটক ও ভূগোলবিদ মাকদিসি তাদের সম্পর্কে লিখেছেন- তাঁরা উন্নত চরিত্রের অধিকারী এবং তাদের হাতের লেখাও খুব সুন্দর। আবুল কাসেম ইসমা‘ঈল বিন আহমদ সমরকন্দী ছিলেন তার সময়ের একজন শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস। বাগদাদের জামে মানসুরে হাদীস দারস দিতেন। ইবনুল জাওযী লিখেছেন, তিনি ওয়াররাকদের বাজারে বই বিক্রি করতেন।[৪]

আবূ জা’ফর আহমদ ইবনু মুহাম্মদ ইবনে আইউব বাগদাদি ছিলেন, তদানীন্তন বাগদাদের প্রখ্যাত আলেম। যিনি কা’ব ইবনু ইয়াহিয়া ইবনে খালেদ বার্সাকীর গৃহে অবস্থান করে বইপত্রের অনুলিপি প্রস্তুত করতেন। আবুল ফযল মানসুর বিন নসর বিন ‘আব্দুর রহিম নিশাপুরিও কাপড়ের ব্যবসা করতেন। আল্লামা সামআনি তার সম্পর্কে লিখেছেন- খোবাসানের প্রসিদ্ধ মানসুরি কাগজের জুড়ি ছিল না। আবুল হাসান মুহাম্মদ বিন আলী বিন ‘আব্দুল্লাহ ওয়াররাক ছিলেন শামের বিখ্যাত মুহাদ্দিস। তিনি কলম ও কালি বিক্রি করতেন। আবূ ‘আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ বিন আহমদ বাগদাদের বাবে নববীর পাশে কালি বিক্রি করতেন। ব্যবসার সাথে উলামাদের নামের তালিকা দীর্ঘ। ‘আব্দুল্লাহ ইবনু মোবারকও ব্যবসা করতেন। তাজকিরাতুল হুফফাজে তার জীবনী আলোচনায় যাহাবী তাঁকে ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দিয়েছেন।

উলামায়ে কিরামগণ কখনো কখনো রাজদরবারে চাকরি করেছেন। ইবনু হাযম আন্দালুসি ছিলেন খলিফা মুস্তানতাহির বিল্লাহর উযির। শাফে’য়ী মাযহাবের ফকিহ কামালুদ্দিন ছিলেন সুলতান নুরুদ্দিনের দরবারের সভাসদ। ইবনু খাল্লিকান তাঁর প্রশংসা করেছেন। মাওলানা তাজুদ্দীন ইব্রা-হীম পাশা ছিলেন ‘উসমানী সুলতান বায়জীদ ইলদ্রিমের মন্ত্রী। আবূ বক্র আহমদ ইবনু সালমান বিন হাসান ছিলেন হাম্বলী মাযহাবের আলেম। তিনি বাগদাদে বসবাস করতেন। প্রতি শুক্রবার জামে মানসুরে তাঁর দু’টি মজলিস হতো। জুমু‘আর আগে তিনি হাম্বলী ফিক্বাহর আলোকে প্রশ্নের উত্তর দিতেন। জুমু‘আর পর হাদীসের দরস দিতেন। তিনি লেপ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সালেম বিন ‘আব্দুল্লাহ একজন প্রথিতযশা আলেম ছিলেন। তিনি বাজারে ব্যবসা করতেন। দাঊদ বিন আবী হিন্দ রেশমি চাদর বিক্রি করতেন। ইমাম আবূ হানীফ ছিলেন প্রসিদ্ধ বস্ত্র ব্যবসায়ী। বিখ্যাত ক্বারী হামযাহ্যিয়াত, যাইতুনও আখরোটের ব্যবসা করতেন। কুফায় তিনি বসবাস করতেন। মুহাম্মদ ইবনু সুলাইমানের ছিল ঘোড়ার ব্যবসা। জ্ঞানের জগতে এসকল দিকপাল জ্ঞান চর্চা ও বিতরণে কার্পণ্য করতেন না। সংসার পরিচালনার অর্থ যোগাড় হলেই তারা কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে ‘ইল্ম চর্চায় ব্যাপৃত হতেন।

হালাল রিয্ক ছাড়া ‘ইবাদত হয় না। রাব্বে কারীমের নৈকট্য অর্জনও হয় না। সে কারণে স্বহস্ত-উপার্জনকে প্রাধান্য দেয়ার বহুল প্রচলন ছিল। উলামা কিরামেগণ কাপড়ের ব্যবসা পছন্দ করতেন। এ জন্য অনেকেই এই ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েন। এমনই একজন আলেম হলেন ফুরাত কাজাজ তামিমি। তার জন্মস্থান বসরায় হলেও তিনি কুফায় বসবাস করতেন। ছিল কাপড়ের ব্যবসা। আবূ মনসুর আব্দুর রহমান বিন গালেব একজন সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ছিলেন। অনেকের থেকে তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনিও কাপড়ের ব্যবসা করতেন। আবুল হাসান মোহাম্মদ বিন সান্নান বিন ইয়াজিদ হাদীসের দরস দিতেন। পাশাপাশি তার ছিল কাপড়ের ব্যবসা। আবূ ইয়াহইয়া বিন ঈশা ছিলেন ইমাম মালেকের ছাত্র। অনেক মুহাদ্দিস থেকে তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনিও ছিলেন কাপড় ব্যবসায়ী। আবূ সুলাইমান আইউব বিন সালমান বসরায় বসবাস করতেন। তার পেশা ছিল সূতি কাপড়ের ব্যবসা। রবি বিন সালেম বসরায় পুরাতন কাপড়ের ব্যবসা করতেন। আবূ ইসহাক ইব্রা-হীম বিন হুসাইন হাল্লাজ ছিলেন বাগদাদের নামজাদা কবি ও সাহিত্যিক। তিনি তুলার ব্যবসা করতেন।

আবূ বক্র ‘আব্দুল্লাহ ইবনু গাজাল ছিলেন হাসান বসরীর ছাত্র। তিনি সুতার ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। আবূ মনসুর মুহাম্মদ বিন আব্দুল আজিজ বাগদাদের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন। তিনি সুতার ব্যবসা করতেন। তিনি ব্যবসার ফাঁকে হাদীস পড়ার জন্য মিম্বরে যেতেন। খত্বীব বাগদাদী তাঁর কথা উল্লেখ করেছেন। মাওলানা ‘উসমান খায়রাবাদী একজন তুখোড় আলেমে দ্বীন ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে ‘ফাওয়াযেদুল ফুয়াদে’ সুলতানুল মাশায়েখ নিজাম উদ্দিন আউলিয়া লিখেছেন, তিনি সব্জি বিক্রি করতেন এবং শালগম ও অন্যান্য তরকারি রান্না করে বিক্রি করতেন। এমন নয় যে,তিনি আধুনিককালের মতো নামের মাওলানা ছিলেন। স্বয়ং নিজাম উদ্দিন আউলিয়া লিখেছেন, তিনি কুরআনের মুফাস্সির ছিলেন। মাওলানা মানাজির আহসান গিলানী লিখেছেন আহমদ হাসান কানপুরির ছেলের কথা। তিনি নিজেও পিতার মতো বড় আলেম ছিলেন। তিনিও দোকানে বসে মিঠাই বিক্রি করতেন। কানপুরে তার মিঠাইয়ের খুব সুনাম ছিল।

আলেমদের অনেকের সাবানের ব্যবসা ছিল। শাইখুল ইসলাম আবূ ‘উসমান ইসমা‘ঈল ইবনু ‘আব্দুর রহমান ইবনে আহমদ সাবুনি নিশাপুরি নিশাপুরের বিখ্যাত ফকিহ ও মুহাদ্দিস। প্রায় ৬০ বছর তিনি ‘ইল্ম চর্চায় নিয়োজিত ছিলেন। নিয়মিত ওয়াজ নসিহত করতেন। নিশাপুরের বাইরে খোরাসানগজনি, হিন্দুস্থান, জুরজান, তাবাবিস্তান, শাম, আজারবাইজান প্রভৃতি অঞ্চল সফর করে হাদীসের দরস দিতেন। তাঁর সাবানের ব্যবসা ছিল। আবূ মোহাম্মদ ‘আব্দুল্লাহ ইবনু আহমদ ছিলেন এমন আরেকজন সাবান ব্যবসায়ী আলেম। উলামাদের কেউ কেউ মাটির পাত্র তৈরিতে দক্ষতা অর্জন করেন। সা‘ঈদ ইবনু যুর‘আ ছিলেন একজন মুহাদ্দিস। তিনি আবূ ‘আব্দুল্লাহ সাওবান থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর পেশা ছিল মাটির তৈরি পাত্র বিক্রির। আবূ বক্র মোহাম্মদ ইবনু ‘আলী রাশেদী ছিলেন ব্যাকরণবিদ। তিনিও মাটির পাত্র বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

‘ইবাদত কবুলিয়াতের দু’টি শর্ত প্রনিধানযোগ্য। তন্মধ্যে একটি হলো রিয্ক হালাল হওয়া আর দ্বিতীয়টি হলো নাজাসাত-তাহারাত অর্থাৎ- পবিত্রতা-অপবিত্রতা সম্পর্কে সম্যক্ জ্ঞান থাকা। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, নবী-রাসূল এবং সলফে-সালেহীনগণ হালাল রিয্েিকর বিষয়ে সবিশেষ গুরুত্বারোপ করতেন। দ্বীন প্রচার কিংবা ইল্ম চর্চার পাশাপাশি হালাল রিয্কের প্রয়োজনে কোনো না কোনো পেশা বেছে নিয়েছিলেন। যেমন প্রথম নবী ও মানুষ আদম (‘আ.)-এর পেশা ছিল কৃষি। তিনি জমি চাষ করতেন। জমি চাষাবাদ করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন। ‘ঈশা (‘আ.) ও নূহ্ (‘আ.) পেশায় কাঠমিস্ত্রী ছিলেন। নৌকা প্রস্তুতকারী হিসেবে নূহ্ (‘আ.)-এর সুখ্যাতি ছিল। তিনি মহান আল্লাহর নির্দেশে নৌকাও বানিয়ে ছিলেন। ইদ্রিস (‘আ.) নিজে পোশাক নির্মাতা বা দর্জি ছিলেন। দর্জি পেশা অবলম্বন করে সেলাই কাজ করতেন এবং মানুষকে পোশাক পরিধানের শিক্ষা দিতেন। প্রবাদ আছে- মহান আল্লাহর সৃষ্ট মানুষ, আর মানুষের সৌন্দর্য সৃষ্টির উপায় হলো পোশাক। ইদ্রিস (‘আ.) মহান আল্লাহর সৃষ্টি মানুষকে অপরূপা করার জন্য পোশাক তৈরির পেশাকে বেছে নেন।

ইলিয়াস (‘আ.) বুনন কাজে পারদর্শি ছিলেন। তাঁত পেশা অবলম্বন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। মূসা (‘আ.) মেষ পালক ছিলেন। মাদাইয়ানের নবী শু‘আইব (‘আ.)-এর অধীনে তিনি জীবনের বহু সময় মেষ পালনের কাজ করেছেন। এভাবে হালাল ও উপার্জিত রিয্ক অর্জনে নবীগণ সকলেই তৎপর ছিলেন। অনুরূপভাবে ত্রুটিমুক্ত রিয্কের ব্যাপারে পরবর্তী সলফে-সালেহীন ও আকাবেরে দ্বীনগণ কঠোরভাবে অনুসরণ করতেন।

ইতিহাস থেকে অবগত হওয়া যায় যে, উলামায়ে কিরাম নিজেরা বিভিন্ন বৈধ পেশায় জড়িয়েছেন। আবার তাদের পেশাজীবি ছাত্রদের সুবিধা অসুবিধার দিকেও তারা খেয়াল রাখতেন। ওয়ালীদ ইবনু ‘উত্ববাহ্ (রাযি.)’র ঘটনা থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি দামেশকের জামে মসজিদে হাদীস পড়াতেন। একজন ছাত্র প্রায়শঃ দরসে বিলম্বে পৌঁছাতো। তিনি একদিন প্রশ্ন করলে ছাত্র জানালো সে ব্যবসা করে। সকালে উঠে দোকানের মাল খরিদ করে দরসে আসে, ফলে দেরী হয়ে যায়। এ কথা শুনে ওয়ালীদ ইবনু ‘উত্ববাহ্ (রাযি.) বলেন, আজ থেকে তোমাকে এখানে আসতে হবে না। মসজিদের দরস শেষে আমি তোমার দোকানে গিয়ে তোমাকে হাদীস পড়াবো। নিঃস্বার্থভাবে একমাত্র, মহান আল্লাহকে রাজী-খুশি করার জন্য ইল্ম বিতরণের কী ত্যাগ, যা কল্পনা করা যায় না!

সুপ্রিয় পাঠকমণ্ডলী! আপনারা হয়তো জানেন ‘ঈসা ইবনু আবূ ‘ঈসা একজন বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি ইমাম শাবী ও ইমাম নাফে থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন ওয়াকী ইবনু মাইসারাহ। জীবিকার তাগিদে তিনি নানা পেশা অবলম্বন করেছেন। কাপড় সেলাই করতেন তাই ‘খইয়াত’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। এছাড়া গম কেনাবেচার কাজও তিনি করতেন এইজন্য অনেকে তাঁকে ‘হান্নাত’ (গম বিক্রেতা) বলে অভিহিত করতেন। এছাড়া তিনি গাছের পাতা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ইতিহাস সূত্রে অবগত হওয়া যায় যে, সবাই সহজ পেশা গ্রহণ করেননি। কেউ কেউ জীবিকার তাগিদে কঠিন পরিশ্রমের দিকে ঝুঁকেছেন। এমনই একজন আবূ জাফর মুহাম্মদ বিন ইসহাক বিন মেহরান। তিনি ছিলেন মুহাদ্দিস। ইসহাক বিন ইউসুফ থেকে তিনি হাদীস বর্ণনা করেন। বিন মেহরান জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে আনতেন। সেই লক্ড়ি বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। জীবন সংগ্রামে অমিত বীর ওলী-আউলিয়াদের এমনিতরো উদাহরণের শেষ নেই।

সম্মানিত পাঠকমণ্ডলী! বর্তমানে মাদ্রাসায় পড়ানো কিংবা মসজিদে ইমামতি করার পাশাপাশি রোজগারের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়ানো অনেকেই খারাপ মনে করে থাকেন। ভাবেন, আলেম মানেই তো শুধু মাদ্রাসা, মসজিদ কিংবা খানকাহ্ নিয়েই পড়ে থাকা এক গোষ্ঠীর নাম। আজকাল সাধারণের পাশাপাশি এমনটা আলেমরাও ধারণা করে বসেছেন। অথচ নিজ হাতে জীবিকা উপার্জন করা একটা সন্দেহাতীতভাবে উত্তম কাজ। এটা তাক্বওয়া, পরহেজগারীর বিপরীত কোনো বিষয় নয়। ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি যে, সাহাবায়ে কিরাম বিভিন্ন পেশায় জড়িত ছিলেন। লক্ষাধিক সাহাবীর জীবনী পর্যালোচনা করলে সেসব বিষয়ে জানা যায়। তাঁরা নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, কারিগরী, শ্রম ও অন্যান্য হালাল পেশা অবলম্বন করতেন।

খোলাফায়ে রাশেদীনের চারজনের তিনজনই ছিলেন ব্যবসায়ী। আবূ বক্র ও ‘উসমান ইবনু আফফান উভয়ে কাপড়ের ব্যবসা করতেন। ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযি.)’র খেজুরের ব্যবসা ছিল। ‘আলী ছিলেন শ্রমজীবি। তিনি পানি উত্তোলনের কাজসহ কৃষিকাজ করতেন। বলাবাহুল্য, প্রয়োজন মোতাবেক খরচ অর্জিত হলেই তাঁরা আর কাজ করতেন না। ইসলামের প্রচার-প্রসারকল্পে নিবেদিত থাকতেন। সা’দ ইবনু আবী আক্কাস ও সালমান ফারসি (রাযি.) কর্মকার ছিলেন। সা’দ ইবনু আবি ওয়াক্কাস তীর বানাতেন। কৃষি কাজের সাথে আরো জড়িত ছিলেন জায়েদ ইবনু সাবেত, আবূ হুরাইরাহ্ ও মিকদাদ ইবনু আসওয়াদ। জায়েদ ইবনু সাবেত কৃষি কাজের পাশাপাশি লেখকের কাজ করতেন। তিনি ওয়াহী লিখতেন। খালিদ বিন ওয়ালিদ সৈনিক ছিলেন। তিনি নিজ প্রতি ভাবলে সেনাপতির মর্যাদায় উন্নীত হয়েছিলেন। উল্লিখিত আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, জীবিকার্জনের প্রয়োজনে গুণী ব্যক্তিদের যে কোনো পেশায় নিয়োজিত হতেন।

সেকালে খেজুর পাতা, বাঁশ, গাছের ছাল ইত্যাদি উপকরণ দিয়ে টুক্রি বানানো হতো। উলামায়ে কিরামের অনেক টুক্রি তৈরিতে পারদর্শিতা অর্জন করেন। মুসলিম বিন মাইমুন খাওয়াস ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার একজন মুহাদ্দিস। দিনের বেশিরভাগ সময় তিনি ‘ইবাদত বন্দেগীতে কাটাতেন। তার জীবিকা ছিল টুকরি তৈরি করে বাজারে বিক্রি করা। আবূ সারামাহ্ ‘ঈসা ইবনু মাইমুন ছিলেন একজন বিখ্যাত মুফাস্সির। তিনিও টুকরি বিক্রি করতেন। শীতকালে শীত নিবারনের জন্য আবার অনেকে অভ্যাসবশত মোজা ব্যবহার করে থাকেন। ওলামাদের অনেকে মোজা বিক্রি করতেন। আতা বিন মুসলিম খফফাফ কুফি হালবে বসবাস করতেন। তিনি মোজা বিক্রি করতেন। সেকালে বসরা থেকে মোসুলে বড় বড় নৌকা চলাচল করতো। পুরানো হয়ে গেলে ওই নৌকাগুলো ভেঙ্গে এর তক্তা ও অন্যান্য জিনিষ বিক্রি করা হত। আবার অনেকে নৌকা মেরামত করে বিক্রি করতো। এইভাবে নতুন একা পেশাজীবি শ্রেণি গড়ে উঠে। অদ্যাবধি সারা দুনিয়ায় এই পেশার প্রচলন দেখা যায়। উলামা কেরামের অনেকে এই পেশাতেও যোগ দেন।

আবূ রবি সোলাইমান বিন মুহাম্মদ বসরি একজন হাদীস বর্ণনাকারী ছিলেন। বসরার অধিবাসী এই মুহাদ্দিস আতা ইবনু আবী রবা ও মুহাম্মদ ইবনে সিরীন থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার সম্পর্কে আল্লামা সামআনি লিখেছেন, তিনি বসরায় নৌকা বিক্রি করতেন। আবুল ফজল জাফর বিন মুহাম্মদ বিন আহমদ বাগদাদিও এই পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। কোনো পন্য বিক্রয়ের লক্ষ্যে অনেক সময় নিলাম হতো। নিলাম কাজে জড়িতদের মুনাদি বলা হতো। আবূ বক্র আহমদ বিন মূসা বিন মুহাম্মদ নিশাপুরের বাজারে নিলাম ডাকতেন। নিলাম ডাকাই ছিল তাঁর পেশা। আবূ জাফর মুহাম্মদ বিন আবূ কাউদ উবাইদুল্লাহ বিন ইয়াজিদও এই পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন। অঞ্চল পরিবেশ ও প্রয়োজনীয়তার নিরীখে উলামা-মাশায়েখ জীবিকার্জনের অনুষঙ্গ হিসেবে নানা পেশা অবলম্বন করতে দেখা যায়। বস্তুত বসরা ছিল নদী নির্ভর অঞ্চল। টাইগ্রিস, ইউফ্রেটিসও শাত আল আরবের মিলনে সমৃদ্ধ বসরায় নৌ ব্যবসায় ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। অনুরূপভাবে নিশাপুরও ছিল পাহাড়ি, ঝরণা ও সেচনালা নির্ভর কৃষি নগরী। পাহাড়ি ঝরনা ও ছোট ছোট নদীর কারণে এখানেও জলযান নির্মাণ হতো। উপায় ও উপকরণের চমৎকার ভারসাম্য উলামাদের জীবিকা অর্জনের পথকে সহজতর করে তুলেছিল।

অভিনব ও আবশ্যিক প্রয়োজন চিহ্নিত করে উলামাগণ দ্বীনি খেদমতের পাশাপাশি জীবিকার্জনের উপায় খুঁজেবের করতেন। তদানীন্তন আমলে মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র গোসলখানার ব্যবস্থা ছিল। শুধুমাত্র কর্ডোভা নগরীতেই নয়শো গোসলখানা ছিল। এসব গোসলখানায় গরম পানি, সাবান ও তৈলের ব্যবস্থা থাকতো। আয়ের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই গোসলখানাগুলো। যারা গোসলখানা নির্মাণের মাধ্যমে আয় করতেন তাদের হাম্মামি বলা হতো। সর্বপ্রথম ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উসমান ইবনে আবুল আস সাকাফি বসরার একটি হাম্মাম নির্মাণ করেন। এর দ্বারা তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। এটির অবস্থান ছিল ‘ঈসা ইবনু জাফরের প্রাসাদের সন্নিকটে। মুসলিম বিন আবূ বক্র বসরার আরেকটি হাম্মাম নির্মাণ করেন। এই আয় দিয়ে তার সংসার নির্বাহ হতো। আবুল হাসান ‘আলী আহমদ ইবনু ‘উমার ছিলেন বাগদাদের শীর্ষস্থানীয় মুহাদ্দিসের একজন। তিনিও হাম্মাম নির্মাণ করে তার দ্বারা উপার্জন করতেন। আবূ তালেব মুহাম্মদ বিন উবাইদুল্লাহ বিন আহমদ করতেন চালের ব্যবসা। আবুল কাশেম ‘আলী বিন আহমদ বিন মুহাম্মদও চালের ব্যবসা করতেন। আবূ মুহাম্মদ হাসান ইবনু ‘আলী ইবনে মূসা করতেন ডালের ব্যবসা। আবুল আহাম্মদ ইবনু মুহাম্মদ ইবনে আহমদ তহহান যিনি আরেকজন ডাল ব্যবসায়ী ছিলেন।

সুপ্রিয় পাঠকমণ্ডলী! লক্ষ্য করার বিষয় এই যে, সংসার জীবনের প্রতিটি বিষয় চিহ্নিত করে আলেমগণ ব্যবসায় ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতেন। এমনটি নয় যে, অধিক মুনাফা লাভের আশায় একই পেশায় হুমড়ে পড়তেন। কিংবা চড়াদামে বিক্রির আশায় দাম ধরে থাকতেন। তারা বিলক্ষণ জানতেন যে, অতিরিক্ত মুনাফা সূদের সমতুল্য। আর সুদ তো ইসলামে সর্বোতভাবে পরিতাজ্য। তাদের ভারসাম্য পূর্ণ উৎপাদন, বিপনন ও মূল্য নিয়ন্ত্রের ফলশ্রুতিতে একটা চমৎকার অর্থ ব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল। ২/৪ বছরেও দ্রব্য মূল্য উঠানামা করতো না। ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে নায্যমূল্যে প্রয়োজনীয় ক্রয় ও ভোগ করতে পারতেন। দ্রব্যমূল্যের উঠানামা, ফটকাবাজারী, মজুতদারী ইত্যকার ঘৃণ্য প্রথার প্রচলন ছিল না।

ব্যবসা পরিগ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার বাছ-বিচার ছিল না। একেবারেই প্রয়োজনের নিরীখেও সুবিধা মতো উপায় এঁদের সকলেই কোনো না কোনো ব্যবসায় জড়িত ছিলেন সে কথা আমরা পূর্বেই বলেছি। এদের একজন ছিলেন আবূ ইসহাক ইব্রাহিম বিন মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ। তিনি একজন প্রখ্যাত ওয়ায়েজ ছিলেন। তিনি বেশ কিছু জিহাদে অংশ গ্রহণ করেন। তিনি রুটি বিক্রি করে উপার্জন করতেন। আবুল হাসান ‘আলী বিন সুলাইমান বিন ইয়াত্ত রুটি বিক্রেতা ছিলেন। আবূ মুহাম্মদ সাহল বিন নসর বিন ইব্রাহিম বাগদাদের একজন খ্যাতিমান মুহাদ্দিস ছিলেন। তার একটি হোটেল ছিল। আর এটিই ছিল তার আয়ের একমাত্র উৎস। আবূ সা‘ঈদ মুহাম্মদ বিন আহমদ ইস্পাহানিও হোটেল চালাতেন। আবূ ইসহাক ইব্রাহিম বিন ইউসুফ বিন মাইমুন ছিলেন নির্ভরশীল হাদীস বর্ণনাকারী। তিনি ‘আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক ও সুফ্ইয়ান ইবনু উযাইনাহ প্রমূখ থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। তিনি মুরগি পালতেন, মুহাম্মদ বিন ‘আলী বিন জাফর বিন মাকিয়ানিও মুরগি পালতেন এবং বাজারে বিক্রি করতেন। আবূ আব্দুর রহমান হোসাইন বিন আহমদ ছিলেন ইমাম মুসলিমের সাগরিদ। তিনি দুধ বিক্রেতা ছিলেন। আবূ সা’দ নসর বিন ‘আলী ইমারত নির্মাণ উপকরণ পাথরের ব্যবসা করতেন।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা মানুষ ও জিন্ জাতিকে সৃষ্টি করেছেন শুধুমাত্র ‘ইবাদত করার জন্য। প্রশ্ন আসতে পারে- ‘ইবাদত কী এবং কোনটি? ‘ইবাদত শব্দটি আরবি ‘ইবাদাহ থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো- মহান আল্লাহর উপাসনা, আনুগত্য ও একমাত্র তাঁর সন্থষ্টির জন্য কাজ করা। ‘ইবাদতের উপায় বহুবিধ। মানুষের সারাটি জীবন ‘ইবাদতের আঁধার হতে পারে। মহান আল্লাহর হুকুম ও নবী (সা.)-এর তরীকা অনুসরণ করে নিত্য জীবনের প্রতি মুহূর্ত ও ইভেন্ট ‘ইবাদত হতে পারে।

নবী (সা.)-এর হুকুম অনুসন্ধান করে জীবন পরিচালনা করা ‘ইবাদত। নামায, রোযা, তিলাওয়াত, যিক্র-আযকার, যাকাত, কুরবানী ও দান-সাদাক্বাহ্ ছাড়াও আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ইবাদত হলো- আল্লাহর পথেমানুষকে আহ্বান করা। ইহ ও পরকালীন সফলতা লাভের উপায় আল্লাহ বাতলিয়ে দিয়েছেন। কুরআনুল কারীমে বিঘোষিত হয়েছে-

﴿وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُوْنَ إِلَىالْخَيْرِ وَيَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُوْلَئِكَهُمُ الْمُفْلِحُوْنَ﴾

অর্থাৎ- “আর তোমাদের মধ্যে একটা দল থাকা চাই, যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে ও অন্যায় থেকে নিষেধ করবে। বস্তুত তারাই সফলকাম।”[৫]

যারা দা’ওয়াতের কাজ করে তাঁদের দাঈ‘ বলা হয়। আর দাঈ‘দের দা’ওয়াত ইসলামের আলোক বর্তিকা। দা’ওয়াত থাকবে তো দ্বীন থাকবে। আর দা’ওয়াত না থাকলে দ্বীন থাকবে না। ‘ঈসা (‘আ.)-এর অন্তর্ধান পরবর্তী দা’ওয়াতের কাজ বন্ধ ছিল। ফলে র্শিকের সয়লাব বয়ে যায়। বায়তুল্লাহতে ৩৬০টি মূর্তি প্রতিষ্ঠাপিত হয়। সমগ্র আরব তথা বিশ্বে আল্লাহ দ্রোহীতার বীজ উপ্ত হয়। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক ক্ষেত্রে লজ্জাকর বিপর্যয় নেমে আসে। এমনি একটি সময়ে একজন নেতার আবির্ভাব অনুভূত হচ্ছিল। বিশ্বখ্যাত সেমেটিক অধ্যাপক পি. কে হিট্টি বলেন, “The stage was set, The moment was psydoligical comiaj for great national leader.”

মহানবী (সা.)-এর আবির্ভাবের ফলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পায়। ঐক্য, সংহতি ও সম্প্রীতির ঢেউয়ে কলুষিত সমাজ পরিচ্ছন্ন হয়।

ইসলামের আবির্ভাব শুধু ব্যক্তির কল্যাণের জন্য নয়; সমগ্র মানব জাতির কল্যাণের জন্য ইসলাম। আর ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের সৌভাগ্য দু’টি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল : সীলাহ ও ইসলাহ। অর্থাৎ- নিজে সংশোধন হওয়া এবং অন্যকে সংশোধন করা। আর দা’ওয়াতের কাজ ছাড়া যা কখনো সম্ভব নয়।

নিজের সংশোধন ও অন্যের সংশোধনের জন্য ইল্ম অর্জন আবশ্যক। এজন্য ইল্ম অর্জন করা জরুরি। অনুরূপভাবে অর্জিত বিতরণও তেমনি জরুরি। ইল্ম অর্জন ও দাঈ‘ হিসেবে ইল্ম অনুশীলন ও বিতরণ যারা করবেন তাদের সংসার জীবন কীভাবে নির্বাহ হবে? ইতিপূর্বে অবগত হওয়া যায় যে, পেশাগত ব্যস্ততা উলামায়ে কিরামকে ইল্ম চর্চা হতে দূরে সরায়নি। সকল ব্যস্ততার পরেও তারা নিজেদের ইল্ম চর্চায় ব্যস্ত রেখেছেন। সময়ের যথাযথ ব্যবহারের কারণে তা সম্ভব হয়েছে। তাঁরা সময় নষ্ট করতেন না। তারা সস্তা বিনোদনের ফাঁদে কখনো পা দেননি। ইল্মই ছিল তাদের বিনোদন। আবূ ‘ইমরান মূসা ইবনু মুহাম্মদ ইবনু সা‘ঈদ আন্দালুসি একদা তার ছেলে বলেছিলেন, “তুমি কি মুতাআলার বাইরে অন্য কিছুতে আনন্দ পাচ্ছো?” উত্তর ছিল- “আল্লাহর শপথ! আমিতো এর মতো তৃপ্তি আর কিছুতেই পাই না।” ইল্মের প্রতি দুনির্বার আকর্ষনের ফলে তারা সর্বোচ্চ সময় এর পেছনেই ব্যয় করতেন।

ফাতাহ ইবনু খাকান ছিলেন একজন বিদগ্ধ কবি এবং সাহিত্যিক। ‘আব্বাসীয় খলিফা মুতাওয়াক্কিল তাঁকে মন্ত্রীর দায়িত্বে নিযুক্ত করেন। দায়িত্বের সীমাহীন ব্যস্ততা সত্বেও তিনি প্রচুর পড়ালেখা করতেন। খলিফা দরবার থেকে বের হলেই তিনি হাঁটতে হাঁটতে কিতাব পড়তেন। খলিফা দরবার থেকে অল্প সময়ের জন্য উঠলেই তিনি নিবিষ্টচিত্তে পড়া শুরু করতেন। তার ব্যক্তিগত পাঠাগার ছিল মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পাঠাগার। আবুল ফজল মুহাম্মদ বিন আহমদ মারওয়াযি বলখি ছিলেন একাধারে মন্ত্রী ও বিচারক। তিনি দায়িত্ব পালনের ফাঁকে ফাঁকে লেখালেখি করতেন। জ্ঞানচর্চার এমনিতরো অভাবনীয় উপমা আমাদের চমৎকৃত করে।

উলামায়ে কিরাম নানা পেশা অবলম্বন করে স্বাবলম্বিতা অর্জন করতেন। ওই অর্জিত অর্থ দিয়ে তারা কিন্তু বিলাসিতা করতেন না। অলসতাও বিলাসিতা ছিল তাঁদের স্বভাব বিরুদ্ধ অভ্যাস। তারা সাধারণতঃ উপার্জিত অর্থের বেশিরভাগই জনকল্যাণে ব্যয় করতেন। ইমাম লাইস ইবনু সা’দ তাঁর জমিদারী থেকে বার্ষিক আশি হাজার দিনার পেতেন। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, তিনি তার পুরোটাই অভাবগ্রস্থ ছাত্র ও আলেমদের জন্য ব্যয় করতেন। বিদ্যাচারের প্রতি কতটা অনুরাগী হলেই এ সমস্ত ভূমিকা গ্রহণ সম্ভব।

‘আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক ব্যবসা থেকে উপার্জিত অর্থ দরিদ্র ফক্হি ও মুহাদ্দিসদের জন্য ব্যয় করতেন। ইমাম আবূ উমাইদ মুহাম্মদ বিন ‘ইমরান তার সময়ে তার গৃহে ৫০টি বিছানা তৈরি রাখতেন, যেন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সফরে আসা ছাত্র ও আলেমরা সেখানে নির্বিঘ্নে অবস্থান করতে পারে। ইমাম হাফস ইবনু কুফি একজন প্রথিতযশ্যা মুহাদ্দিস ছিলেন। কুফায় বসবাসকারী এই মুহাদ্দিস ছিলেন সাতিশয় দানশীল। তিনি বলতেন যে, “আমার ঘরে খাবার খাবেন না, আমি তাঁর কাছে হাদীস বর্ণনা করবো না।” এমনি হাজারো উপমাতে ভরা তদানিন্তন ব্যক্তিবর্গ ইল্মচর্চা করছেন। অবাবিত করেছেন ইল্মচর্চার সকল দিক।

ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহ্.) ছিলেন যগ্মসিদ্ধ বস্ত্র ব্যবসায়ী। ন্যায় পরায়ন ও সৎ ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি ছিল। ইসলামী জ্ঞানদ্বীপ্ত ফিকহ শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি নিজ ব্যবসায়ের প্রতি যত্নশীল ছিলেন। ইমাম মালেক ইবনু আনাস (রাযি.) ছিলেন শিক্ষক ও হাদীস বিশারদ। হাদীস চর্চার পাশাপাশি শিক্ষকতার মাধ্যমে যৎসামান্য প্রাপ্ত হাদিয়া ছিল তার গ্রামাচ্ছাদনের উপায়। ইমাম মুহাম্মদ ইবনু ইদ্রিস আশ-শাফে‘য়ী (রহ্.) জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি জীবিকার্জনের জন্য কাজীর দায়িত্ব পালন করতেন। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলের পেশা ছিল শিক্ষকতা। যৎসামান্য বেতনে তার নিত্যদিনের ব্যয় কোনোভাবে চলতো। হাদীস সংগ্রহ করেই তিনি তৃপ্তবোধ করতেন। তাঁর সংগৃহীত হাদীস বিশ্ববাসীর কাছে অমূল্য সম্পদ। তেমনিভাবে কাল থেকে কালান্তরে পণ্ডিতগণ ইসলামের খিদমত করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনের আহার বিলাস তাদের আকৃষ্ট করতে পারেনি।

কিন্তু আধুনিককালে আমরা কি দেখছি। বক্তৃতা করে কিংবা ইল্ম শিক্ষা দিয়ে পয়সা উপার্জন যেন সর্বগ্রাহ্রতা লাভ করেছেন। বক্তারা যখন মাহফিলে যান, অগ্রিম চুক্তি করেন।

২০১১ সালে আমার মরহুম পিতা হাজী মো. সেতাব উদ্দিনের রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে প্রায় চল্লিশ শতাংশ জমি ওয়াকফ করে একটি ক্বওমী মাদ্রাসা গড়ি। প্রচলিত রেওয়াজ অনুসারে মানুষকে জানান দেওয়ার জন্য মাহফিল করতে হয়। জনৈক বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক, যিনি চমৎকার ওয়াজ করেন। তাঁর পিতার খ্যাতির সৌরভে সুরভিত হয়ে দেশব্যাপী ওয়াজের জন্য খুবই প্রসিদ্ধি অর্জন করেন। তাঁকে একবার ওয়াজ করবার জন্য আহ্বান করেছিলাম। তিনি বললেন, বিশ হাজার টাকা লাগবে। আমি বললাম, আচ্ছা একটু এদিক-ওদিক করে হবে। তিনি বললেন, নাহ! ভাই ১৮/২০ তো হতেই হবে। তাজ্জব হয়ে গেলাম। তাকে আর আসার জন্য অনুরোধ করিনি। আমি এমনও জানি যে, ৫,০০০/- টাকা সাইনবোর্ড টাঙ্গানোর আর ৫০,০০০/- টাকা খরচের ঝুঁকি নিতে হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকার মানুষকে। শুধুমাত্র উদ্বোধন করবেন। দু’জনের যাতায়াত বিমান ভাড়া, মোটা খাম ও ভূরিভোজ তো আছেই।

সম্মানিত পাঠকমণ্ডলী! আমি কিন্তু Hate sin, not the sinner দর্শনে বিশ্বাসী। কাউকে আঘাত দিতে চাইনি। কেউ গায়ে মাখবেন না। যদি করতে চান, তাহলে ধরে নিব, ‘ঠাকুর ঘরে কে?, আমি তো কলা খায়নি’ দলের লোক আপনি।

আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, দাঈ‘ হিসেবে আমার ভূমিকা আমি কতটুকু রাখছি। কিয়ামতের মাঠে এইজন্য তো জিজ্ঞাসিত হতে হবে। আল্লাহর রহমতে দেশের আনাচে কানাচে ক্বওমি মাদ্রাসার জাল বিস্তৃত হয়েছে। সমগ্র বাংলাদেশে আমাদের জনমতে অলক্ষেব কম নয়। দক্ষিণের হাটহাজারী, মেথল, পটিয়া থেকে উত্তরে রাজশাহী নওগার বৃহদকারের অসংখ্য মাত্রাসার কথা আমরা জানি। যাত্রাবাড়ির মাদ্রাসা মুহাম্মাদীয়া আরাবীয়া, মিরপুর মাদ্রাসায় প্রচুর সংখ্যক ছাত্র প্রতি বছর বের হয়, এমনিভাবে প্রতিবছর হাজার হাজার আলেম দাওরাতুল হাদীস সম্পন্ন করছে। কিন্তু তাদের কর্মক্ষেত্র সে অনুযায়ী সম্প্রসারিত হচ্ছে না। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এরা বসে নেই। তাঁরা সকল ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা ও মেধার স্বাক্ষর রাখছেন। কিন্তু সরকারি কর্মকাণ্ডের মতো মূল স্রোতধারায় আজও উপনীত হতে পারেনি। ইসলামের নানান দিকে অবদান রাখছেন ঠিকই কিন্তু ইপ্রিত উপায়ে স্বোপার্জনের ক্ষেত্রটা তেমন দৃশ্যমান হচ্ছে না। অথচ এঁরা তথ্য প্রযুক্তি, প্রকাশনা অফিস ব্যবস্থাপনা, গ্রাম্য ডাক্তারী, ইউনানী চিকিৎসা ও হালাল উপায়ে ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি অবদান রাখতে পারেন। আকাবির, আসলাম, সাহাবী ও নবী-রাসূলদের হালাল জীবিকা অন্বেষনের পথ অনুসরণ করে আজও সমাজ ও দেশের অনুকরণীয় আদর্শের ভূমিকার আবির্ভূত হতে পারেন। ✋


[১] সূরা আল-আহ্যা-ব ৩৩ : ৪০।

[২] মিশকা-তুল মাসা-বীহ- হা. ২১২।

[৩] সূরা আল-বাক্বারাহ্ : ২০১।

[৪]  পেশাজীবি আরেক নাম। আল্লামা সামআনি বলেন, ‘ওয়াররাক বা কুরআনুল কারীম, হাদীস ও অন্যান্য বইপত্র লেখার কাজ করে। এছাড়া কাগজ বিক্রি করে তাদেরকেও ওয়াররাক বলা হয়। আলেমদের অনেকেই এই পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। ‘ইল্মচর্চার পাশাপাশি জীবিকার্জনের জন্য পেশাটি তাঁদের পছন্দের ছিল। ইবনু খালদুনের মতে, বইয়ের অনুলিপি প্রস্তুত করা ছাড়াও প্রুফ দেখা, বাঁধাই করা এবং বই সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ ওয়াররাকরা সম্পন্ন করতেন।

[৫] সূরা আ-লি-‘ইমরান : ১০৪।


আপনার মন্তব্য1

ঢাকায় সূর্যোদয় : 6:43:16 সূর্যাস্ত : 5:30:54

সাপ্তাহিক আরাফাতকে অনুসরণ করুন

@সাপ্তাহিক আরাফাত