আঁধার ফুঁড়ে আলোর রেখা ফোটে, আর সেই আলোর কণাগুলোই একসময় সুবিশাল সূর্যের রূপ দেখায়। তেমনি ১৯৪৬ সালে বাংলার জমিনে যে তাওহীদের মশাল জ্বেলে ছিলেন দূরদর্শী আলেম ও মহান সংস্কারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহেল কাফী আল-কুরায়শী (রহ্.), সেই মশালেরই এক উজ্জ্বল শিখা হয়ে প্রজ্জ্বলিত হয়েছে জমঈয়ত শুব্বানে আহলে হাদীস বাংলাদেশ। এটি কেবল একটি সংগঠন নয়, এটি একস্বপ্ন, এক প্রত্যয়, এক দীর্ঘ পথচলার অবিচ্ছিন্ন উপাখ্যান। আজ যখন এই তারুণ্যদীপ্ত কাফেলা তাদের ১১তম কেন্দ্রীয় সম্মেলনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, তখন স্মৃতির আয়নায় ভেসে ওঠে এর জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত প্রতিটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়, প্রতিটি বাধা-বিপত্তির কাহিনী, আর ভবিষ্যতের জন্য বুনে রাখা সীমাহীন স্বপ্নগুলো। এটি কেবল একটি প্রবন্ধ নয়, এ যেন এক প্রেমিকের হৃদয়ের নিংড়ে দেওয়া কথামালা, যেখানে প্রতিটি শব্দে মিশে আছে ভালোবাসা আর ত্যাগ।
১. প্রতিষ্ঠার ইতিহাস : অঙ্কুর থেকে মহীরুহ- জমঈয়ত শুব্বানে আহলে হাদীস বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা আকস্মিক কোনো ঘটনা ছিল না; বরং তা ছিল একটি গভীর চিন্তাভাবনা, একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং সময়ের অনিবার্য প্রয়োজনের ফসল। এর শেকড় প্রোথিত রয়েছে বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীস-এর এক বিশাল ও মহৎ ঐতিহ্যের গভীরে। বাংলার জমিনে যখন র্শিক, বিদ‘আত আর কুসংস্কারের মেঘ ঘনীভূত হয়ে দিগন্ত ঢেকে দিচ্ছিল, তখন ১৯৪৬ সালে আব্দুল্লাহেল কাফী আল-কুরায়শী (রহ্.) সাহেব কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর নির্ভেজাল বাণী প্রচারের মহান ব্রত নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীস। তাঁর দূরদৃষ্টি ছিল অপরিসীম। তিনি বুঝেছিলেন, একটি জাতির মেরুদণ্ডকে সোজা করতে হলে, তাকে তার শেকড়ের সঙ্গে জুড়ে দিতে হবে- অর্থাৎ- সরাসরি কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরিয়ে আনতে হবে।
তবে, যে কোনো মহৎ আন্দোলনের সফলতার জন্য প্রয়োজন হয় তারুণ্যের দৃপ্ত অংশগ্রহণ। যুবশক্তি ছাড়া কোনো বিপ্লবই সফল হয় না। কাফী সাহেব ও তার উত্তরসূরিরা উপলব্ধি করলেন যে, মূল সংগঠনের দা’ওয়াতী কার্যক্রমকে আরো গতিশীল ও সম্প্রসারিত করতে, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মনন ও মেধা বিকাশে একটি স্বতন্ত্র যুব সংগঠনের গুরুত্ব অপরিহার্য। এই ভাবনা থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় জমঈয়ত শুব্বানে আহলে হাদীস বাংলাদেশের ধারণা। মূল সংগঠনের আদর্শ, উদ্দেশ্য এবং কর্মপদ্ধতিকে নিজেদের বুকে ধারণ করে, কিন্তু নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলার প্রত্যয় নিয়েই একঝাঁক উদ্যমী তরুণের হাতে গড়ে ওঠে এই সংগঠন।
প্রতিষ্ঠার প্রথম দিনগুলো ছিল যেন চারাগাছের অঙ্কুরোদগমের মতো। সামান্য পুঁজি, অফুরন্ত উদ্যম আর অদম্য ঈমানী শক্তি ছিল তাদের একমাত্র সম্বল। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত, সর্বত্র তারা তাওহীদের দা’ওয়াত নিয়ে ছুটে গেছেন। তরুণদের একত্রিত করা, তাদের মাঝে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া এবং তাদেরকে একটি আদর্শিক জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করাই ছিল তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। এই সময়টায় প্রতিটি সদস্য ছিলেন যেন এক একজন নিরলস সৈনিক, যারা শুধু নিজেদের জন্য নয়; বরং উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণের জন্য নিজেদের বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন। এভাবেই বিন্দু বিন্দু করে গড়ে ওঠে জমঈয়ত শুব্বানের প্রথম বুনিয়াদ। প্রতিটি ইট, প্রতিটি পাথরে লেগে ছিল তাদের মেধা, শ্রম আর আন্তরিকতার পরশ।
২. উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি : পথচলার মাইলফলক- একবার যাত্রা শুরু হলে আর ফিরে তাকানোর সুযোগ থাকে না। প্রথম দিকের সেই ক্ষুদ্র পরিসর থেকে জমঈয়ত শুব্বানে আহলে হাদীস বাংলাদেশ উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি লাভ করেছে। একটি চারাগাছ যেমন ধীরে ধীরে মহীরুহে পরিণত হয়, ঠিক তেমনি এই সংগঠন ও তার কর্মপরিধি এবং প্রভাব বিস্তার করেছে। এই সমৃদ্ধি এসেছিল ধারাবাহিকতা, সুপরিকল্পিত কর্মপন্থা এবং কর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ।
দা’ওয়াতী কার্যক্রমের বিস্তার : জমঈয়ত শুব্বানের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর মধ্যে একটি হলো তাদের দা’ওয়াতী কার্যক্রমের বিশাল বিস্তার। তারা শুধু শহরে নয়, প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলেও দা’ওয়াতের বার্তা নিয়ে গেছে। বছরের পর বছর ধরে আয়োজিত অসংখ্য ইসলাহী মাহফিল, তারবিয়াহ ক্যাম্প, সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামগুলো লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে, যুবকদের লক্ষ্য করে আয়োজিত কর্মশালাগুলো তাদের মনে বিশুদ্ধ ইসলামী ‘আক্বিদার বীজ বুনে দিয়েছে। এই কার্যক্রমগুলো মানুষকে র্শিক-বিদ‘আতমুক্ত একটি জীবনযাপনের দিকে আহ্বান জানিয়েছে, যা জাহেলিয়াতের ঘন অন্ধকারে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বেলেছে।
শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চায় অবদান : সংগঠনটি কেবল মুখস্থ দা’ওয়াতী কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তারা নিয়মিতভাবে তাফসীরুল কুরআন ও দরসে হাদীসের আয়োজন করে, যেখানে দেশের প্রথিতযশা উলামায়ে কিরামগণ বিশুদ্ধ জ্ঞান বিতরণ করেন। যুবকদের মধ্যে গবেষণা ও অধ্যয়নের আগ্রহ তৈরি করতে বিভিন্ন সেমিনার ও পাঠচক্রের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও, বিভিন্ন মাদ্রাসা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও তারা শিক্ষাবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জ্ঞানকে তারা জাহেলিয়াত দূর করার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখেছে।
সাংগঠনিক কাঠামো ও বিস্তার : প্রতিষ্ঠার পর থেকে শুব্বান একটি সুসংগঠিত কাঠামো গড়ে তুলেছে। কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা এবং স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কাঠামোর মাধ্যমেই তারা তাদের কার্যক্রমকে সুসংহত করে এবং তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। নিয়মিত কর্মী সমাবেশ, কাউন্সিল এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মীদের মধ্যে দক্ষতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সংগঠনের গতিশীলতা নিশ্চিত করেছে। দেশের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত তাদের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তাদের প্রভাবের পরিধিকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
প্রকাশনা ও মিডিয়া : জ্ঞান প্রসারের অন্যতম মাধ্যম হলো প্রকাশনা। জমঈয়ত শুব্বান এই ক্ষেত্রেও পিছিয়ে থাকেনি। নিয়মিত স্মরণিকা, মাসিক পত্রিকা (মাসিক তর্জুমানুল হাদীস) এবং বিভিন্ন পুস্তিকা প্রকাশের মাধ্যমে তারা ইসলামী জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করেছে। আধুনিক যুগে এসে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে, যা দা’ওয়াতী কার্যক্রমকে আরো দ্রুত এবং বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছে। এটি ছিল সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার এক সাহসী পদক্ষেপ।
সমাজ সংস্কারমূলক কার্যক্রম : শুধুমাত্র ধর্মীয় দা’ওয়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে, জমঈয়ত শুব্বান বিভিন্ন সমাজ সংস্কারমূলক কার্যক্রমেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। মাদকাসক্তি, ইভটিজিং, যৌতুক প্রথা, বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধিগুলোর বিরুদ্ধে তারা সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালিয়েছে। পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো -এসব মানবিক কাজও তাদের কর্মতালিকায় স্থান পেয়েছে, যা সমাজের কাছে তাদের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে।
৩. বাধা-বিপত্তি : পথের কাঁটা আর অদম্য প্রত্যয়— কোনো মহৎ কাজই বাধাহীনভাবে সম্পন্ন হয় না। জমঈয়ত শুব্বানে আহলে হাদীস বাংলাদেশের সুদীর্ঘ পথচলাও এর ব্যতিক্রম ছিল না; বরং তাদের এই জয়যাত্রা ছিল অসংখ্য বাধা-বিপত্তি, ভুল বোঝাবুঝি এবং প্রতিকূলতার সঙ্গে নিরন্তর এক যুদ্ধ। এই বাধাগুলোই তাদের পরীক্ষা করেছে, তাদের ঈমানকে শানিত করেছে এবং তাদের প্রত্যয়কে করেছে আরো অদম্য।
প্রথমত, ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রচার : আহলে হাদীস মানহাজ যেহেতু কুরআন ও সুন্নাহকে সরাসরি অনুসরণ করে এবং প্রচলিত অনেক রীতিনীতি থেকে নিজেদের দূরে রাখে, তাই অনেক সময়ই তাদের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে বা অপপ্রচারের শিকার হতে হয়েছে। মৌলবাদ, চরমপন্থা বা বিভেদ সৃষ্টির অভিযোগ এনে তাদের কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই অপপ্রচারগুলো মোকাবেলায় শুব্বানের কর্মীরা ধৈর্য, প্রজ্ঞা এবং দলিলের মাধ্যমে সঠিক তথ্য তুলে ধরেছেন। তারা বুঝেছিলেন, মিথ্যা একদিন অপসৃত হবেই, যদি সত্যের ওপর অবিচল থাকা যায়।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ। সমাজের কিছু অংশের রক্ষণশীল মনোভাব এবং কখনও কখনও রাজনৈতিক অস্থিরতাও তাদের কার্যক্রমকে ব্যাহত করেছে। দা’ওয়াতী প্রোগ্রামে বাধা দেওয়া, সম্মেলন আয়োজনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা এবং কর্মীদের হয়রানি করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এসব চাপ তাদের মনোবল ভাঙতে পারেনি; বরং তারা আরো দৃঢ়তার সাথে নিজেদের লক্ষ্যে অটল থেকেছেন। তাদের কাছে ঈমানের মজবুত দেয়াল ছিল সবচাইতে শক্তিশালী আশ্রয়।
তৃতীয়ত, আর্থিক সীমাবদ্ধতা : একটি অলাভজনক সংগঠন হিসেবে, জমঈয়ত শুব্বানকে প্রায়শই আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে হয়েছে। বিশাল আকারের কার্যক্রম পরিচালনা, প্রকাশনা এবং সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য যথেষ্ট তহবিলের অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু তারা মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে এবং নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ ও শ্রম দিয়ে এই প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেছেন। সদস্যদের ত্যাগ ও নিবেদনই ছিল তাদের প্রধান পুঁজি।
চতুর্থত, অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ : এত বড় একটি সংগঠনে বিভিন্ন সময়ে মতপার্থক্য বা দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা দেখা যাওয়া স্বাভাবিক। নেতৃত্ব, কর্মপন্থা বা কৌশল নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু জমঈয়ত শুব্বান সবসময়ই আলোচনা, পরামর্শ এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে। তারা সবসময় ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছে এবং বিভেদকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাই তাদের শক্তি জুগিয়েছে।
পঞ্চমত, আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জ : একুশ শতকে এসে তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত প্রসার, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব এবং তরুণদের বহুমুখী চাহিদা এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ভুল তথ্য ও ফিতনার বিস্তার, পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসন এবং যুবকদের মোবাইল আসক্তি ইত্যাদি বিষয়গুলো তাদের দা’ওয়াতি কার্যক্রমকে আরো জটিল করেছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শুব্বান নতুন কৌশল অবলম্বন করেছে, যেমন- ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়তা এবং আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি গ্রহণ।
এই সব বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও, জমঈয়ত শুব্বানে আহলে হাদীস বাংলাদেশ কখনও তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি; বরং প্রতিটি বাধাই তাদের আরো শক্তিশালী করেছে, তাদের প্রত্যয়কে আরো মজবুত করেছে। তারা প্রমাণ করেছে, সত্যিকারের ঈমানী শক্তি এবং বিশুদ্ধ ‘আক্বিদার ওপর ভরসা থাকলে কোনো বাঁধাই স্থায়ী হতে পারে না।
৪. বর্তমান কার্যক্রম : আলো ছড়ানো নিরন্তর প্রয়াস— জমঈয়ত শুব্বানে আহলে হাদীস বাংলাদেশ অতীতের অর্জনগুলোকে পাথেয় করে বর্তমানে এক গতিশীল ও বিস্তৃত কর্মযজ্ঞে লিপ্ত রয়েছে। তাদের বর্তমান কার্যক্রমগুলো শুধু ধর্মীয় দা’ওয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা সমাজের সার্বিক উন্নয়নে ও যুব সমাজের মনন বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।
দা’ওয়াত ও তারবিয়াহ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা : শুব্বান নিয়মিতভাবে সারা দেশব্যাপী দা’ওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জুমু‘আর খুৎবাহ্, সাপ্তাহিক ও মাসিক তাফসীরুল কুরআন এবং দরসে হাদীসের আয়োজন তাদের নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। বিশেষ করে, যুবকদের জন্য “তারবিয়াহ ক্যাম্প” ও “ইসলামিক কুইজ প্রতিযোগিতা” অত্যন্ত জনপ্রিয়, যা তরুণদের মধ্যে ইসলামী জ্ঞান অর্জনে আগ্রহ তৈরি করে। এসব প্রোগ্রামের মাধ্যমে তারা কুরআন ও সহীহ হাদীসের নির্ভুল বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
শিক্ষা ও গবেষণা : বর্তমান সময়ে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। শুব্বান বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করছে এবং ইসলামী শিক্ষার প্রসারে কাজ করছে। তারা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ স্টাডি সার্কেল ও সেমিনারের আয়োজন করে, যাতেতারা তাদের জ্ঞানকে আরো গভীর করতে পারে। বিভিন্ন গবেষণামূলক কাজেরও তারা সহযোগিতাকরে থাকে, যা ইসলামী জ্ঞানকে আরো সুপ্রতিষ্ঠিত করে।
সামাজিক সংস্কার ও সচেতনতা : জাহেলিয়াতের বিরুদ্ধে তাদের স্লোগান কেবল মুখেই নয়, বাস্তবেও তারা এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে। মাদক, ইভটিজিং, সাইবার ক্রাইম, অনৈতিক সম্পর্ক ইত্যাদি আধুনিক জাহেলিয়াতের বিরুদ্ধে তারা যুবকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে তারা দা’ওয়াতী কাজের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে, যেখানে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার সমাধান তুলে ধরা হয়।
সাংগঠনিক শক্তিশালীকরণ : কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনের কাঠামোকে আরো শক্তিশালী করার জন্য তারা নিয়মিত কর্মী সম্মেলন, প্রশিক্ষণ কর্মশালা এবং কাউন্সিলিং সেশনের আয়োজন করছে। নতুন সদস্যদের আকৃষ্ট করা এবং পুরনো সদস্যদের সক্রিয় রাখা, উভয় ক্ষেত্রেই তারা কাজ করছে। নেতৃত্ব বিকাশের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যোগ্য নেতৃত্বে আসতে পারে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়তা : আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শুব্বান ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তাদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেল, ফেসবুক পেইজ এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো দা’ওয়াতি কাজের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। লেকচার, খুতবাহ্, শর্ট ভিডিও এবং ইনোগ্রাফিক্সের মাধ্যমে তারা লাখো মানুষের কাছে তাদের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে, যা বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
মানবিক ও সেবামূলক কার্যক্রম : শুব্বান শুধু ধর্মীয় দা’ওয়াত নয়, মানবিকতার ডাকেও সাড়া দেয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ (যেমন- বন্যা, ঘূর্ণিঝড়) আক্রান্তদের ত্রাণ বিতরণ, শীতবস্ত্র বিতরণ, অসুস্থদের সহযোগিতা এবং অভাবীদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কার্যক্রমও তারা পরিচালনা করে। এসব কাজ সমাজের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা এবং মানবিক মূল্যবোধের পরিচায়ক।
আন্তঃসংগঠনিক সম্পর্ক : বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন এবং সামাজিক সংস্থার সাথে তারা সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলে। মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণে তারা ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় বিশ্বাসী এবং এজন্য বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো।
জমঈয়ত শুব্বানের বর্তমান কার্যক্রমগুলো প্রমাণ করে যে, তারা কেবল অতীতের ঐতিহ্যের ধারক নয়; বরং বর্তমানের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন পূরণেও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপই যেন জাহেলিয়াতের অন্ধকার দূর করে আলোর মশাল জ্বেলে দেওয়ার এক নিরন্তর প্রয়াস।
৫. ভবিষ্যতের স্বপ্ন : দিগন্তজোড়া সম্ভাবনা— একটি সংগঠন তখনই সফল হয় যখন তার চোখে থাকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন, যখন তার পরিকল্পনাগুলো শুধু বর্তমানের জন্য নয়; বরং সুদূর ভবিষ্যতের পথও আলোকিত করে। জমঈয়ত শুব্বানে আহলে হাদীস বাংলাদেশ সুদীর্ঘ পথচলায় অসংখ্য অর্জনকে নিজেদের ঝুলিতে পুরেছে, কিন্তু তাদের চোখ এখন আরো সুদূরপ্রসারী, তাদের হৃদয়ে বুনো আছে দিগন্তজোড়া স্বপ্ন।
ক. জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা : তাদের স্বপ্নের কেন্দ্রে রয়েছে একটি প্রকৃত জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। এমন একটি সমাজ যেখানে কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞানই হবে সকল প্রজ্ঞা ও বিদ্যার উৎস। এর জন্য তারা আরো বেশি মাদ্রাসা, ইসলামিক সেন্টার এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চায়। তারা চায় প্রতিটি তরুণ যেন কুরআন ও হাদীসের গভীর জ্ঞান লাভ করে এবং নিজেদের জীবনে তা বাস্তবায়ন করতে পারে।
খ. নৈতিক ও আদর্শিক যুবসমাজ গঠন : ভবিষ্যতের স্বপ্ন পূরণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি আদর্শিক ও নৈতিকতাসম্পন্ন যুবসমাজ তৈরি করা। শুব্বান চায় এমন এক প্রজন্ম যারা মাদক, অশ্লীলতা, সন্ত্রাসবাদ এবং সর্বপ্রকার অন্যায় থেকে মুক্ত থাকবে। তারা যুবকদেরকে ইসলামের প্রকৃত সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, যারা সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবে। এই জন্য তারা আরো কার্যকর তারবিয়াহ প্রোগ্রাম এবং আধুনিক মনোবিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে যুবকদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে কাজ করতে ইচ্ছুক।
গ. প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার : ডিজিটাল যুগে এসে দা’ওয়াতী কার্যক্রমকে আরো কার্যকর করতে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার তাদের অন্যতম লক্ষ্য। তারা উন্নতমানের ইসলামিক অ্যাপস তৈরি, অনলাইন লাইব্রেরি স্থাপন, আন্তর্জাতিক মানের ইসলামিক ভিডিও কন্টেন্ট তৈরি এবং ভার্চুয়াল কনফারেন্স আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী দা’ওয়াত ছড়িয়ে দিতে চায়। সোশ্যাল মিডিয়াকে তারা জ্ঞান বিতরণ ও ভুল ধারণার অপনোদনের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ঘ. অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ও কর্মসংস্থান : একটি শক্তিশালী সংগঠন হতে হলে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অপরিহার্য। শুব্বান শুধুমাত্র অনুদানের উপর নির্ভরশীল না থেকে নিজস্ব অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার স্বপ্ন দেখে। পাশাপাশি, তারা যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন Vocational Training Program চালু করতে চায়। এর মাধ্যমে তরুণরা কেবল দ্বীনের খেদমতেই নয়; বরং অর্থনৈতিকভাবেও স্বাবলম্বী হবে।
ঙ. সমাজকল্যাণ ও মানবসেবার প্রসার : মানবসেবা ইসলামের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। জমঈয়ত শুব্বান তাদের সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রমকে আরো বিস্তৃত করতে চায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন এবং পরিবেশ সংরক্ষণে তারা আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে চায়। একটি মডেল ভিলেজ বা আদর্শ গ্রাম প্রতিষ্ঠা তাদের স্বপ্নের অংশ হতে পারে, যেখানে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার সকল সুন্দর দিক বাস্তবায়িত হবে।
চ. মুসলিম উম্মাহর ঐক্য : মুসলিম উম্মাহর অনৈক্য বর্তমানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জমঈয়ত শুব্বান এই অনৈক্য দূর করে কুরআন ও সুন্নাহর পতাকা তলে সবাইকে একত্রিত করার স্বপ্ন দেখে। তারা চায় ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক সহযোগিতা যেন উম্মাহর চালিকাশক্তি হয়। আন্তর্জাতিক ইসলামী সংগঠনগুলোর সাথে যোগাযোগ স্থাপন এবং বৈশ্বিক মুসলিম সমস্যা সমাধানে অবদান রাখার আকাঙ্ক্ষা তাদের রয়েছে।
ছ. বিশ্বব্যাপী দা’ওয়াত : তাদের স্বপ্ন শুধু বাংলাদেশের সীমানায় আবদ্ধ নয়; বরং তারা চায় বিশ্বব্যাপী কুরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ দা’ওয়াত পৌঁছে দিতে। এই জন্য তারা আন্তর্জাতিক স্কলারদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন, বৈদেশিক মিশনে অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে তাদের প্রতিনিধিত্ব করার পরিকল্পনা করছে।
১১তম কেন্দ্রীয় সম্মেলন হলো এই স্বপ্নের পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। এটি কেবল অতীতের অর্জনকে স্মরণ করা নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য নতুন করে প্রতিজ্ঞা করার একটি দিন। জমঈয়ত শুব্বানে আহলে হাদীস বাংলাদেশ বিশ্বাস করে, মহান আল্লাহর উপর অবিচল আস্থা এবং নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাদের এই সব স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে। এই তারুণ্যের জয়যাত্রা কেবল সুদীর্ঘ পথচলা নয়, এটি এক অনাগত ভবিষ্যতের সূচনা, যা ইসলামের সোনালী দিগন্তকে আরো উজ্জ্বল করে তুলবে।
উপসংহার : ঐতিহ্যের পথ ধরে তারুণ্যের এই জয়যাত্রা, জমঈয়ত শুব্বানে আহলে হাদীস বাংলাদেশের প্রতিটি পদক্ষেপে এক নতুন ইতিহাস রচনা করছে। ১৯৪৬ সালের সেই দূরদর্শী প্রজ্ঞা থেকে শুরু করে আজকের এই তারুণ্যের উদ্দীপনা পর্যন্ত, এই সংগঠন প্রমাণ করেছে যে, দৃঢ় সংকল্প, নিরলস পরিশ্রম এবং মহান আল্লাহর ওপর অবিচল বিশ্বাস থাকলে সকল বাধা অতিক্রম করে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব। এই ১১তম কেন্দ্রীয় সম্মেলন যেন সেই প্রতিজ্ঞারই নবায়ন। আমরা বিশ্বাস করি, কুরআন ও সুন্নাহর এই নির্ভুল পতাকাতলে একত্রিত হয়ে জমঈয়ত শুব্বান আগামী দিনেও জাহেলিয়াতের বুনিয়াদ ভেঙে, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলো ছড়িয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ, সমৃদ্ধ এবং আদর্শ মুসলিম জাতি গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। আল্লাহ তা‘আলা তাদের সকল প্রচেষ্টা কবুল করুন এবং ভবিষ্যতের এই স্বপ্নযাত্রা বরকতময় করুন -আমীন। ✋

আপনার মন্তব্য1