দুশ্চিন্তা ও পেরেশানী করতে নিষেধ করে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন :
(وَلَا تَهِنُوْا وَلَا تَحْزَنُوْا وَاَنْتُمُ الْاَعْلَوْنَ اِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِیْنَ)
“তোমরা হীনবল ও দুঃখিত হয়ো না, বস্তুতঃ তোমরাই জয়ী থাকবে, যদি তোমরা মু’মিন হও।”১
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন :
(وَلَا تَحْزَنْ عَلَیْهِمْ وَلَا تَكُ فِیْ ضَیْقٍ مِّمَّا یَمْكُرُوْنَ)
“আর তাদের নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না ও তারা যে ষড়যন্ত্র করে তার কারণে মনঃক্ষুণ্ন হয়ো না।”২
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন :
(لَا تَحْزَنْ اِنَّ اللّٰهَ مَعَنَا١)
“বিষণ্ন হয়ো না, অবশ্যই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।”৩
সত্যিকারের ঈমানদারদের প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে জানাচ্ছেন যে,
(فَلَا خَوْفٌ عَلَیْهِمْ وَلَا هُمْ یَحْزَنُوْنَ)
“তাদের কোনো ভয় নেই আর তারা দুঃখিতও হবে না।”৪
বিষণ্নতা
মনের কাজ করার ইচ্ছা শক্তিকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে অকেজো বানিয়ে দেয়।
বিষণ্নতা মানুষকে কাজ করতে বাধ্য না করে; বরং কাজ না করতে বাধ্য করে।
দুঃখবোধ করে আত্মার কোনো লাভ হয় না। শয়ত্বানের সবচেয়ে প্রিয় কাজ হলো
‘ইবাদতগুযার ব্যক্তিকে বিষণ্ন করে দেয়া, যাতে সে ক্রমাগত ‘ইবাদত না করতে
পারে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন :
(اِنَّمَا النَّجْوٰى مِنَ الشَّیْطٰنِ لِیَحْزُنَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا)
“মু’মিনদেরকে বিষণ্ন করার জন্য শয়ত্বানের পক্ষ থেকে গোপন পরামর্শ বা চক্রান্ত করা হয়ে থাকে।”৫
নিম্নোক্ত হাদীসখানিতে নাবী কারীম (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন :
إِذَا كُنْتُمْ ثَلَاثَةً فَلَا يَتَنَاجَى اثْنَانِ دُوْنَ صَاحِبِهِمَا فَإِنَّ ذٰلِكَ يُحْزِنُهُ.
“যখন
তোমরা তিনজন সাথী একত্রে থাকবে তখন একজনকে বাদ দিয়ে অপর দু’জনে গোপন
পরামর্শ করবে না। কেননা, এ কাজ তৃতীয় ব্যক্তির দুঃখের কারণ হবে।”৬
কিছু
কিছু কঠোরমনা মানুষ যা বিশ্বাস করে, তার বিপরীতে ঈমানদারদের দুঃখিত হওয়া
উচিত নয়। কারণ দুঃখবোধ এমন এক অবস্থা যা মন-মানসিকতার ক্ষতি করে।
মুসলমানদেরকে অবশ্যই দুঃখ-বিষণ্নতা দূর করতে হবে এবং আমাদের জীবন ব্যবস্থায়
বৈধ সকল পন্থায় এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। দুঃখ করাতে প্রকৃত কোনো লাভই
নেই। নাবী কারীম (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিচের দু‘আতে এর থেকে
পানাহ চেয়েছেন।
اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ.
“হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা এবং অতীতের দুঃখ-বেদনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি।”৭
এ
হাদীসে উদ্বিগ্নতার সাথে দুঃখ-বেদনাকে যোগ করা হয়েছে। এ দুয়ের মাঝে
পার্থক্য হলো-যদি ভবিষ্যতে কী ঘটবে এ দুর্ভাবনা হয় তবে আপনি উদ্বিগ্নতা বোধ
করছেন। আর যদি অতীতের ঘটনা নিয়ে মন খারাপ হয় তবে আপনি দুঃখবোধ করছেন।
উভয়টাই মনকে দুর্বল করে, অক্ষমতা সৃষ্টি করে ও ইচ্ছা শক্তিকে দমন করে। ওপরে
যা বলা হলো তা সত্ত্বেও মাঝে মাঝে দুঃখবোধ অলঙ্ঘনীয় ও প্রয়োজনীয় হতে পারে।
জান্নাতবাসীরা জান্নাতে প্রবেশ করে বলবে :
(اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِیْۤ اَذْهَبَ عَنَّا الْحَزَنَ)
“সব প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহরই প্রাপ্য, যিনি আমাদের থেকে সব দুশ্চিন্তা দূর করে দিয়েছেন।”৮
এ
আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, তারা ইহজীবনে তেমনি দুঃখগ্রস্ত ছিল, যেমন না-কি
তারা অন্যান্য সমস্যা কবলিত হয়েছিল। উভয়টিই তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।
সুতরাং
যখন কেউ দুঃখপীড়িত হয় এবং এটাকে এড়ানোর কোন পথ থাকে না তখন সে পুরস্কৃত
হয়। কেননা দুঃখ এক ধরনের কষ্ট এবং মু’মিন ব্যক্তি কষ্ট ভোগ করার কারণে
পুরস্কৃত হবে। তবুও মু’মিন ব্যক্তিকে অবশ্যই দু‘আর মাধ্যমে ও অন্যান্য
কার্যকর উপায়ে দুঃখবোধ দূর করতে হবে। যেমনটি মহান আল্লাহর নিম্নের বাণীতে
বুঝা যায় :
(وَلَا عَلٰى الَّذِیْنَ اِذَا مَاۤ اَتَوْكَ لِتَحْمِلَهُمْ
قُلْتَ لَاۤ اَجِدُ مَاۤ اَحْمِلُكُمْ عَلَیْهِ١۪ تَوَلَّوْا
وَّاَعْیُنُهُمْ تَفِیْضُ مِنَ الدَّمْعِ حَزَنًا اَلَّا یَجِدُوْا مَا
یُنْفِقُوْنَ)
“তাদের কোনো অপরাধ নেই, যারা আপনার নিকট বাহনের জন্য
এসেছিলো এবং আপনি তাদের বলেছিলেন ‘আমি তোমাদের জন্য কোনো বাহন পাচ্ছি না।
তারা অর্থব্যয়ে অসামর্থ্যতার কারণে অশ্রু বিগলিত নয়নে ফিরে গেল।”৯
এখানে
তাদের দুঃখের কারণে তাদের প্রশংসা করা হয়নি; বরং দুঃখ সত্ত্বেও তাদের দৃঢ়
ঈমানের প্রশংসা করা হয়েছে। কিন্তু এর সাথে একথার ইঙ্গিতও করা হলো যে, তারা
দুঃখিত হতে বাধ্য হয়েছিল। এ ঘটনা ঘটেছিলো তখন, যখন তারা অর্থাভাবে
প্রয়োজনীয় রসদ যোগাড় করতে না পারায় মহানাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি
ওয়াসাল্লাম)-এর কোনো এক যুদ্ধাভিযানে যোগ দিতে পারেনি।
এ আয়াতটি
মুনাফিক্বদের স্বরূপও উদঘাটিত করেছিল। কারণ তারা যুদ্ধে যোগ না দেয়ার কারণে
দুঃখিত হয়নি। আরো একথা বুঝা গেল যে, সৎকাজ না করতে পারলে মু’মিনগণ দুঃখিত
হতে বাধ্য হোন এবং এর প্রয়োজনও রয়েছে। যেমনটি একটু আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।
সুতরাং
শুভ দুঃখ হলো তা, যা সৎ কাজ করতে পারার কারণে বা পাপ করার কারণে উদ্ভূত
হয়। যখন কেউ মহান আল্লাহর হক্ব আদায় করার ব্যাপারে অবহেলা করার কারণে
দুঃখবোধ করে তখন সে সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত লোকদের বৈশিষ্ট্যই প্রদর্শন করে।
যেমনটি নিম্নের হাদীসে ইঙ্গিত করা হয়েছে। মহানাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি
ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন :
مَا يُصِيْبُ الْمُؤْمِنَ مِنْ هَمِّ وَلَا نَصَبٍ وَلَا حُزْنٍ إِلَّا كَفَّرَ اللهُ بِهِ مِنْ خَطَايَاهُ.
“মু’মিনদের
ওপর উদ্বিগ্নতা, সঙ্কট, অভাব-অনটন বা দুঃখকষ্ট নামে যা কিছুই আপতিত হোক না
কেনো, আল্লাহ তা‘আলা এটাকে তার পাপের প্রায়শ্চিত্তের কারণ বানাবেন।”১০
একথা
থেকে বুঝা যায় যে, মু’মিনগণ দুঃখ-কষ্ট ও পরীক্ষার দ্বারা জর্জরিত হয় এবং
এর বিনিময়ে তাদের কিছু পাপ মাফ হয়। যা হোক, এতে একথা বুঝায় না যে, দুঃখবোধ
কাঙ্খিত কোনো কিছু দুঃখবোধকে ‘ইবাদত মনে করে দুঃখ করা মু’মিনদের উচিত নয়।
দুঃখবোধ করা যদি প্রকৃত কথা হতো তবে নাবী কারীম (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি
ওয়াসাল্লাম) সর্বপ্রথম দুঃখিত হতেন। কিন্তু তিনি কখনো অভাব বোধ করতেন না;
বরং তার চেহারা সদা হাস্য থাকতো, তার আত্মা থাকতো পরিতৃপ্ত এবং তিনি সর্বদা
হাঁসি-খুশি থাকতেন।
হিন্দের বর্ণিত হাদীসإِنَّهُ كَانَ مُتَوَاصِلَ
الْأَحْزَانِ “রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সর্বদা
বিষণ্ন থাকতেন” এ প্রসঙ্গে বলতে হয় -এটি মুহাদ্দিসগণ দ্বারা হাদীসরূপে বা
বিশুদ্ধ হাদীস হিসেবে প্রমাণিত নয়। কেননা এর বর্ণনাকারীগণের মধ্যে একজন
অজ্ঞাত ব্যক্তি আছেন। এটা শুধু এর রাবীদের সনদের বর্ণনাকারীদের ধারাক্রমের
দুর্বলতার কারণেই দুর্বল নয়; বরং নাবী কারীম (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি
ওয়াসাল্লাম) প্রকৃতপক্ষে যেমন ছিলেন তার বিপরীত হওয়ার কারণেও দুর্বল।
আরেকটি হাদীস রয়েছে যে,
إِذَا أَحَبَّ اللهُ عَبْدًا نَصَبَ فِيْ قلْبِهِ نَائِحَةً وَإِذَا أَبْغَضَ عَبْدًا جَعَلَ فِيْ قَلْبِهِ مِزْمَارًا.
“আল্লাহ
তা‘আলা যখন কোনো বান্দাকে ভালো বাসেন, তার অন্তরে ভাব সৃষ্টি করে দেন, আর
যাকে ঘৃণা করেন, তার অন্তরে অহংকার সৃষ্টি করে দেন।”
আমাদেরকে অবশ্যই
লক্ষ্য রাখতে হবে যে, এটি একটি ইসরা-ঈলী বর্ণনা, যা তাওরাতে আছে বলে দাবি
করা হয়। তবুও এতে অবশ্যই সঠিক ভাবার্থ আছে। কেননা মু’মিনগণ সত্যিই তাদের
গুনাহের কারণে দুঃখবোধ করেন এবং পাপীরা সদা খেল-তামাসায় ব্যস্ত, চপল, হালকা
ও আনন্দিত। অতএব, যদি ঈমানদারদের অন্তরে ব্যথা লাগে তবে তা নেক কাজ করার
সুযোগ হারানো বা পাপ কাজ করার কারণেই। এটা পাপীদের বিষণ্নতার বিপরীত যাদের
দুঃখের কারণ দৈহিক আনন্দ বা পার্থিব সুবিধা হারানো। তাদের আকুল আকাক্সক্ষা,
উদ্বিগ্নতা ও বিষণ্নতা সবসময় এ উদ্দেশ্যেই এবং অন্য কোনো কিছুর জন্যই নয়। এ
আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তার নাবী ইসরা-ঈল (‘আলাইহিস্ সালাম) [ইসরা-ঈল
(‘আলাইহিস্ সালাম) ইয়া‘কূব (‘আলাইহিস্ সালাম)-এর আরেক নাম] সম্বন্ধে বলেন-
(وَابْیَضَّتْ عَیْنٰهُ مِنَ الْحُزْنِ فَهُوَ كَظِیْمٌ)
“দুঃখে তার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গিয়েছিল ও তিনি ছিলেন মর্মাহত।”১১
তার
প্রিয় পুত্রকে হারানোর কারণে তার দুঃখের কথা এখানে আমাদেরকে জানানো হলো।
শুধু ঘটনা জানানোর কারণেই কোনো কিছু অনুমোদিত বা অননুমোদিত হয়ে যায় না। আসল
কথা হলো- আমাদেরকে দুঃখবোধ করা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতে আদেশ করা হয়েছে।
যেহেতু এটা দুঃখবোধ তার শিকারের মাথার ওপর বিশাল মেঘখণ্ডের মতো ভেসে বেড়ায়
ও এটা এমন এক প্রাচীর যা তাকে মহৎ লক্ষ্যে পৌঁছতে বাধা প্রদান করে।
এতে
কোনো সন্দেহ নেই যে, বিষণ্নতা একটা ফিতনা ও কষ্ট এবং কিছু রোগ-সাদৃশ্য। যা
হোক, বিষণ্নতা এমন কিছু নয়, যেটাকে ধার্মিকদেরকে কায়মনোবাক্যে কামনা করতে
হবে বা চেষ্টা করে বর্জন করতে হবে।
আপনাকে নির্দেশ করা হয়েছে
সুখ-শান্তির উপায় অন্বেষণ করতে। আপনার জন্য একটি শুভজীবন মঞ্জুর করার জন্য
মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতে, এমন শুভ জীবন, যা আপনাকে একটি স্বচ্ছ,
পরিচ্ছন্ন বিবেক ও একটি প্রশান্ত মন উপহার দিবে। এ সুখ অর্জন করা একটি
প্রাথমিক পুরস্কার ও এমন একটি বিষয়, যা কিছু কিছু লোকের কথায়
নিম্নলিখিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করা হয়েছে। আর তা হলো- “এ পৃথিবীতে একটি
স্বর্গ আছে, আর যে এ স্বর্গে প্রবেশ করবে না, সে পরকালের স্বর্গেও প্রবেশ
করতে পারবে না।”
হাদীসে আছে দুনিয়া মু’মিনদের জেলখানা। সুতরাং এ দু’টি
কথা পরস্পর বিরোধী মনে হচ্ছে। আসল কথা হলো- দুনিয়া কষ্টের জায়গা হওয়া
সত্ত্বেও দুঃখবোধ না করে; বরং স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ ও সন্তুষ্ট থেকে
দুনিয়া নামক এই নরককে স্বর্গে পরিণত করা যায় এবং তাই করা উচিত।
আর আমরা
আল্লাহ তা‘আলার দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেনো আমাদের আত্মাকে সরল-সোজা
পথে পরিচালিত করেন এবং আমাদেরকে দুর্দশাগ্রস্ত, শোচনীয় ও হতভাগা জীবন থেকে
রক্ষা করেন।
১. ৩ নং সূরাহ্ আ-লি ‘ইমরান, আয়াত নং- ১৩৯।
২. ১৬ নং সূরাহ্ আন্ নাহ্ল, আয়াত নং- ১২৭।
৩. ৯ নং সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্, আয়াত নং- ৪০।
৪. ২ নং সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্, আয়াত নং- ৩৮।
৫. ৫৮ নং সূরাহ্ আল মুজা-দালাহ্, আয়াত নং- ১০।
৬. সহীহুল বুখারী- হাঃ ৫৯৩২, সহীহ মুসলিম- হাঃ ৫৮২৬।
৭. সহীহুল বুখারী- হাঃ ২৭৩৬।
৮. ৩৫ নং সূরাহ্ ফাত্বির, আয়াত নং- ৩৪।
৯. ৯ নং সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্, আয়াত নং- ৯২।
১০. মুসনাদুশ শিহাব- ৮২৫।
১১. ১২ নং সূরা ইউসুফ, আয়াত নং- ৮৪।

আপনার মন্তব্য